প্রকাশিত: ১২ আগষ্ট ২০২৬ , ০৯:০০ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির মিশিগান প্রাইমারিতে ড. আব্দুল এল-সায়ীদের ঐতিহাসিক জয়ের পর মার্কিন রাজনীতির ময়দানে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষ এক নতুন ও আক্রমণাত্মক মাত্রা ধারণ করেছে। নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানী এবং মিশিগান থেকে সেনেট প্রাইমারিতে বিজয়ী ড. আব্দুল এল-সায়ীদের মতো ব্যক্তিত্বরা মার্কিন রাজনীতিতে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলেও, তাঁদের এই রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে কট্টর বিদ্বেষ ও ভিত্তিহীন প্রচারণার এক বিশাল তরঙ্গ আছড়ে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সেনেটর টমি টুবারভিল এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ন্যান্সি মেসের মতো উচ্চপর্যায়ের রিপাবলিকান নেতারা সরাসরি ইসলামবিরোধী মন্তব্য করে মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের লক্ষ্যবস্তু করছেন।
আক্রমণ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ধরন
মিশিগান সেনেট প্রাইমারির পর থেকেই রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক কৌশলের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ইসলামোফোবিয়া। এই আক্রমণের প্রধান কয়েকটি দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
জিহাদি ও সন্ত্রাসী আখ্যা: রিপাবলিকান সেনেটর টমি টুবারভিল ড. এল-সায়ীদকে সরাসরি "সন্ত্রাসী" বলে আক্রমণ করেছেন, যেখানে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন স্থানে "জিহাদিদের জয়ী করছে"। এছাড়া কংগ্রেস সদস্য ন্যান্সি মেস মুসলিম পাবলিক অফিস হোল্ডারদের "জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি" বলে অভিহিত করেন।
নাম ও পোশাক নিয়ে কটাক্ষ: ন্যাশনাল রিপাবলিকান সেনেটোরিয়াল কমিটি (NRSC) তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারে জোর দিয়ে আব্দুল এল-সায়ীদের পুরো নাম (আব্দুলরহমান মোহামেদ এল-সায়ীদ) বারবার উল্লেখ করে তাঁকে "আমেরিকার সবচেয়ে কট্টরপন্থী প্রার্থী" বলে চিহ্নিত করছে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মিডিয়ায় নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ড. এল-সায়ীদের হিজাব পরিহিত স্ত্রীর ছবি পাশাপাশি পোস্ট করে "টু ভেরি ডিফারেন্ট আমেরিকাস" (দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আমেরিকা) ক্যাপশন দিয়ে সাংস্কৃতিক বিভাজন উসকে দিয়েছেন।
৯/১১ হামলার মনস্তাত্ত্বিক দাগ: রিপাবলিকান সেনেট প্রার্থী মাইক রজার্স ড. এল-সায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে তিনি নাকি ৯/১১ হামলাকে যৌক্তিক মনে করেন, যদিও এল-সায়ীদ এই দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
মুসলিম ব্রাদারহুড আতঙ্ক: টেক্সাসের রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজ মুসলিম ব্রাদারহুডের তথাকথিত হুমকি নিয়ে সেনেটে শুনানি আহ্বান করে দাবি করেছেন ডেমোক্র্যাটদের মধ্য থেকে আসা এই মুসলিম নেতারা "আমেরিকাকে ঘৃণা করেন"।
ড. আব্দুল এল-সায়ীদের পাল্টা কৌশল ও প্রতিরোধ
রাজনৈতিক এই বিষাক্ত প্রচারণার মুখে ড. এল-সায়ীদ দমে যাননি, বরং তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাঞ্জল ভাষায় এর জবাব দিচ্ছেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
"তারা আমার নাম আর চেহারার দিকে আঙুল তুলে বলবে—‘ও আলাদা’। কিন্তু আমার নাম আপনাদের গ্যাসের দাম বাড়ায়নি; আমার নাম আপনাদের যুদ্ধে নিয়ে যায়নি, আর আমার নামের কারণে কিন্তু আপনারা দোকানে গিয়ে সস্তায় গ্রোসারি কিনতে পারছেন না।"
ট্রাম্পের "দুটি ভিন্ন আমেরিকা" কটাক্ষের জবাবে ড. এল-সায়ীদ সিএনএন-এর সাক্ষাৎকারে পারিবারিক মূল্যবোধকে সামনে এনে বলেন—একদিকে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে বিলিয়ন ডলারের স্বার্থে দুজন মানুষ একসাথে থাকে, আর অন্যদিকে দুজন মানুষ যারা ভালোবাসার ভিত্তিতে পরিবার ও দেশের জন্য ভালো কিছু তৈরি করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করেন, মার্কিন জনগণ একজন প্রার্থীর প্রার্থনার ধরন জানার চেয়ে তিনি দেশের জন্য কী চাইছেন, তাতেই বেশি আগ্রহী।
ফিলিস্তিন নীতি ও নীতিগত পরিবর্তন
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)-এর তথ্যানুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক—২৩০ জনেরও বেশি নির্বাচিত মুসলিম প্রতিনিধি রয়েছেন, যার মধ্যে কংগ্রেসে রয়েছেন চারজন। এই নতুন আমেরিকান-মুসলিম নেতারা মূলত ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সাহায্য বন্ধের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিচ্ছেন।
তাঁদের যুক্তি—বিদেশে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁদের এই সাহসী অবস্থান ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের রাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যেখানে ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থন এখন রাজনৈতিকভাবে একটি দায় বা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ভোটাধিকারের শক্তি
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত মুসলিম ভোটার রয়েছেন, যার বড় একটি অংশ মিশিগান ও পেনসিলভেনিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটেলগ্রাউন্ড বা সুইং স্টেটগুলোতে কেন্দ্রীভূত।
২০২০ সালের নির্বাচনে ডিয়ারবোর্নসহ আরব-মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর সমর্থনেই জো বাইডেন জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বাইডেন প্রশাসনের অটল সমর্থনের কারণে এই ভোটাররা চরম হতাশ হয় এবং ফলাফলস্বরূপ ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়ে বা ভোটদানে বিরত থেকে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয় নিশ্চিত করে।
'আনকমিটেড' (Uncommitted) আন্দোলনের প্রবক্তা আব্বাস আলাউই এবং সংগঠন এমগেজ (Emgage) ও কেয়ার (CAIR)-এর মতো প্রচার গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় আজ এই রাজ্যে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। ডিয়ারবোর্নে এল-সায়ীদের ৮০% ভোট পাওয়া তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ।
ড. আব্দুল এল-সায়ীদের বিজয় কেবল একজন ব্যক্তির সফলতা নয়, এটি মার্কিন রাজনৈতিক মানচিত্রে অনগ্রসর ও নিপীড়িত একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের প্রতীক। রিপাবলিকানদের আক্রমণ ও ইসলামোফোবিয়ার ঢেউ সত্ত্বেও এল-সায়ীদের ইতিবাচক ও সমাধানমুখী রাজনীতি প্রমাণ করছে যে বর্ণবাদ ও ঘৃণার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমেরিকার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে।