এখন সময় বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ১৮ আগষ্ট ২০২৬ , ০৩:৫৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ভেস্তে গেল যুদ্ধবিরতি: ওমানে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ

ইরানের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর তীব্র হতাশায় ফেটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের শুরু করা যুদ্ধ মাসের পর মাস ধরে শেষ করতে না পারার চরম ব্যর্থতার মুখে তিনি এবার তোপ দেগেছেন দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র ও মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের ওপর। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মধ্যস্থতার নামে ওমান যদি যুক্তরাষ্ট্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে দেশটিতে নির্বিচার বোমা হামলা চালানো হবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘ বছর ধরে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা মাসকাটের বিরুদ্ধে এই নজিরবিহীন সামরিক হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত অসহায়ত্বকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে আমেরিকা যখন তার প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তখন মিত্র দেশের ওপর এমন আগ্রাসী ভাষা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্বস্তি ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক পতন ও লক্ষ্যহীন সংঘাতের ছয় মাস

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, যুদ্ধটি চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। ইরানের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের নতজানু করা সম্ভব হবে বলে প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছিল।

কিন্তু সেই চার সপ্তাহের যুদ্ধ ইতোমধ্যে ছয় মাসের সীমা অতিক্রম করেছে এবং এখনো যুদ্ধ বন্ধের কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। গত জুন মাসে উভয় পক্ষ একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) পৌঁছালেও চুক্তির শব্দচয়ন ও শর্তাবলি নিয়ে তীব্র মতবিরোধের কারণে তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। সোমবার নাগাদ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার পর উভয় পক্ষই জানিয়ে দিয়েছে যে, সেই সমঝোতা কার্যত সম্পূর্ণ মৃত। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ফের এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

মিত্র ওমানের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভের কারণ

ফক্স নিউজের প্রতিনিধি ট্রে ইয়িংস্টের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের চরম হতাশা ও ক্ষোভ সরাসরি গিয়ে পড়ে ওমানের ওপর। বছরের পর বছর ধরে সংকট নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে থাকা ওমানের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকে ওয়াশিংটন এখন নিজেদের পরিকল্পনায় বাধা হিসেবে দেখছে।

চলতি বছর ওমানের বিরুদ্ধে এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় সরাসরি হুমকি। এর আগে মে মাসে খবর বের হয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর কর বা ফি আরোপের বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে ওমান। সে সময়ও ক্ষুব্ধ ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওমানকে সবার মতো আচরণ করতে হবে, অন্যথায় দেশটিকে উড়িয়ে দেওয়া হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন ট্রাম্প তেহরানকে নতজানু করতে প্রয়োজনীয় দরকষাকষির সক্ষমতা বা লিভারেজ হারিয়ে ফেলেছেন, তখন ওমানের মতো বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীকেও তিনি শত্রুর কাতারেই দাঁড় করিয়েছেন। তবে ফক্স নিউজের এই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াইট হাউসের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা

যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে এই সপ্তাহেই 'চরম ও ধ্বংসাত্মক' নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এসব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন করিডোর হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ-অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা মূলত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং সহসা সংঘাতের কোনো সমাপ্তি না থাকারই সরাসরি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেকে ধৈর্যশীল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে দাবি করেছেন যে, চুক্তি সম্পাদনে তাঁর কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তিনি আবারও দাবি করেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া থেকে বিরত রাখা।

কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া এবং ওমানের প্রতি ট্রাম্পের এই ক্ষোভ প্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির এক জটিল ও সংকটময় দশাকে উন্মোচিত করেছে:

যুদ্ধ শুরুর প্রতিশ্রুতি বনাম মাঠপর্যায়ের স্থবিরতা: দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন এক অনিঃশেষ চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পরিকল্পনা ছয় মাসেও কার্যকর ফল দেয়নি, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।

কূটনৈতিক মধ্যস্থতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস: ওমান দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনার একমাত্র কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। সেই ওমানকে সামরিক হুমকি দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা মার্কিন কূটনীতির চরম দেউলিয়াত্ব নির্দেশ করে। এর ফলে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়বে।

হরমুজের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি: অনির্দিষ্টকালের নৌ-অবরোধ কেবল ইরান নয়, বরং বিশ্ব তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অচলাবস্থা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব মার্কিন করদাতাদের অর্থনীতিতেই ফিরে আসবে।

কৌশলগত শূন্যতা ও বিকল্পের অভাব: বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এবং মধ্যস্থতার বিকল্প পথ বন্ধ করে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত একটি আত্মঘাতী বৃত্তে আটকা পড়েছে। বোমা হামলার হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার পথ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত থেকে সম্মানজনক প্রস্থান অসম্ভব।

সংক্ষেপে, ওমানের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ কোনো সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতীক নয়, বরং ছয় মাসের ব্যর্থ যুদ্ধ ও অকার্যকর রণকৌশল থেকে জন্ম নেওয়া চূড়ান্ত মানসিক হতাশারই বহিঃপ্রকাশ।