প্রকাশিত: ১৭ আগষ্ট ২০২৬ , ০৮:০৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। গ্রিস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও জার্মানির বিভিন্ন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও প্রাণহানি ঘটেছে, কোথাও হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বেলজিয়ামে। দেশটির পূর্বাঞ্চলের হাই ফেন্স প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায় শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া আগুনে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। এটি বেলজিয়ামের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগুন জার্মান সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বেলজিয়ামের পাশাপাশি জার্মানি ও লুক্সেমবার্গের শত শত দমকলকর্মী কাজ করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বিভিন্ন দেশ থেকে হেলিকপ্টার ও বিমানও পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৬০০ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে সোমবারের বৃষ্টিতে বেলজিয়ামে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে তাপমাত্রা কমে আসায় বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ছে, যা আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীদের সহায়তা করতে পারে। তারপরও বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
গ্রিসে প্রাণ গেল দুইজনের
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের কাছের সালামিনা দ্বীপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানলে অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে শত শত দমকলকর্মী কাজ করছেন। আগুনের তীব্রতা কমাতে আকাশপথেও পানি ছিটানো হচ্ছে। গ্রিসের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোতে দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্পেনেও প্রাণহানি
স্পেনের আরাগন অঞ্চলে দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। সেখানে কয়েক দিন ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। দাবানলের কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ফ্রান্সেও নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় আগুনের কারণে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও কিছু এলাকায় আগুনের তীব্রতা কমেছে এবং নিয়ন্ত্রণে আনার অগ্রগতি হয়েছে।
ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগালেও আগুন
ক্রোয়েশিয়ার পর্যটন এলাকাতেও দাবানলে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পর্তুগালের বিভিন্ন এলাকাতেও বড় ধরনের আগুন জ্বলছে এবং দমকলকর্মীরা তা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
জার্মানিতেও দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশটির কিছু এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় বাসিন্দাদের বাড়িতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের চলমান দাবানলের পেছনে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, খরা ও শুষ্ক আবহাওয়া বড় ভূমিকা রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৪১৫ হেক্টর এলাকা দাবানলে পুড়েছে। যদিও গত বছর একই সময়ে এর পরিমাণ আরও বেশি ছিল, এবারের ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
চলমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, ইউরোপের যেসব অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে বড় দাবানলের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেখানেও এখন আগুনের ঝুঁকি বাড়ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন মূল লক্ষ্য আগুন নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা। একই সঙ্গে চলমান দাবানল আবারও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।