প্রকাশিত: ১৯ আগষ্ট ২০২৬ , ০৯:০৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
নতুন ভিত্তিবছরে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদক মূল্য, মজুরি ও শিল্প উৎপাদনের চিত্র আরও বাস্তবভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ
দেশের অর্থনীতির কাঠামো ও মানুষের ভোগের ধরনে গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন পণ্য, নতুন শিল্প ও সেবা খাত অর্থনীতিতে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের হিসাব নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে।
যে চারটি সূচকের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই), উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই), মজুরি হার সূচক (ডব্লিউআরআই) এবং শিল্প উৎপাদন সূচক (আইআইপি)। এসব সূচক দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার অন্যতম প্রধান উপকরণ।
কেন প্রয়োজন হচ্ছে নতুন হিসাব?
অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে পরিসংখ্যানের ভিত্তিও সময় সময় হালনাগাদ করা প্রয়োজন। কয়েক বছর আগের মানুষের ভোগের ধরন, শিল্পের কাঠামো কিংবা বাজারের পণ্যের তালিকা বর্তমান সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে পুরোনো ভিত্তির ওপর হিসাব করলে অর্থনীতির কিছু পরিবর্তন সঠিকভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
বিবিএসের এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সরকারি তথ্যের মান উন্নত করা এবং অর্থনীতির বর্তমান কাঠামোকে পরিসংখ্যানের মধ্যে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরা।
মূল্যস্ফীতির হিসাবেও আসবে প্রভাব
সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে পরিচিত সূচকগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। বাজারে খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য পণ্য-সেবার দাম কতটা বাড়ছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায় ভোক্তা মূল্যসূচকের মাধ্যমে।
সর্বশেষ জুলাইয়ের হিসাবে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার সামান্য হলেও মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি ছিল।
নতুন ভিত্তিবছর ও পণ্য-সেবার ওজন নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির হিসাব আরও বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিল্প ও উৎপাদনের চিত্রও বদলাবে
শিল্প উৎপাদন সূচক দিয়ে দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন পরিস্থিতি বোঝা হয়। কোন শিল্পের অবদান কতটা, উৎপাদনের কাঠামো কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—এসব তথ্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক ও বিভিন্ন নতুন শিল্পের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে শিল্প উৎপাদনের হিসাবেও বর্তমান কাঠামোর প্রতিফলন প্রয়োজন।
অন্যদিকে উৎপাদক মূল্যসূচক উৎপাদন পর্যায়ে পণ্য ও সেবার দামের পরিবর্তন বুঝতে সহায়তা করবে। ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর এবং সামগ্রিক মূল্যচাপ বিশ্লেষণেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা কাজে আসবে?
অর্থনৈতিক সূচক শুধু পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও গবেষকেরা এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। বাজেট, মুদ্রানীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি নির্ধারণেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই নতুন ভিত্তিতে সূচকগুলো পুনর্নির্ধারণ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে নতুন হিসাব চালুর পর পুরোনো ও নতুন তথ্যের মধ্যে তুলনা করার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন হবে। কারণ ভিত্তিবছর ও পণ্যের ওজন পরিবর্তিত হলে একই সময়ের অর্থনৈতিক চিত্রেও পরিসংখ্যানগত পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, চারটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে “কাগজে-কলমে নয়, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে” পরিমাপ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।