প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৭:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নবম জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ, সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। তবে এই বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ কিছুটা কমালেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার অর্থ বিভাগ নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট জারি করে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘Public Service (Pay and Allowances) Order, 2026’। সরকার গত ১ সেপ্টেম্বর নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছিল। প্রায় ২০ দিন পর আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ হলো। নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে এবং সংশোধিত মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হবে ২০২৭ সালের জুলাই নাগাদ।
নতুন স্কেলে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হচ্ছে। নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হবে। আর প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকার নির্ধারিত মূল বেতন বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা এবং আর্থিক সুবিধাও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামোয় থাকা সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের পর প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো হয়নি। এ সময় খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রেখেছে।
কিন্তু অর্থনীতির বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বেতন বৃদ্ধি সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি দিলেও দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী ও বেসরকারি চাকরিজীবী একই ধরনের আয়বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২২ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ কর্মজীবী মানুষের আয়ের বৃদ্ধি এখনো জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে পড়ে আছে।
আরও বড় উদ্বেগ সরকারি ব্যয়। অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক দায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে এই ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে হয় ঋণ বাড়াতে হবে, নয়তো অন্য খাতের ব্যয় সংকুচিত করতে হবে।
তবে সরকার একবারে পুরো অর্থ বাজারে না ছেড়ে ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো কার্যকর করছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, এর একটি উদ্দেশ্য মূল্যস্ফীতির ওপর আকস্মিক চাপ এড়ানো। একই সঙ্গে সরকারি কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে ভোগব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সরকারের প্রত্যাশা।
এখানেই নবম বেতন স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরীক্ষা। অতিরিক্ত আয় যদি উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে প্রবাহিত হয়, তাহলে এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে পারে। কিন্তু বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়িয়ে শুধু মানুষের হাতে অর্থের পরিমাণ বাড়লে মূল্যস্ফীতি নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
আরেকটি সামাজিক প্রশ্নও সামনে আসছে। সরকারি চাকরিজীবীরা যখন শতভাগের বেশি পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন, তখন বেসরকারি খাতের কোটি কোটি কর্মী, নিম্নআয়ের শ্রমিক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের আয় কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বিত হবে, সেটিও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নতুন বেতন স্কেল তাই শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুখবর নয়। এটি বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শ্রমবাজার এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের আয়বৈষম্যেরও একটি বড় পরীক্ষা।
সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার জরুরি ছিল। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে, সেই স্বস্তির মূল্য যেন সাধারণ ভোক্তাকে নতুন করে বাজারদর বৃদ্ধির মাধ্যমে দিতে না হয়।