ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৩৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

বন্যার কবলে বাংলাদেশ, ১০ লাখের বেশি মানুষ মানবিক সংকটে

টানা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভূমিধসের ফলে আবারও বড় ধরনের মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩, আর পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রায় প্রতিবছরই মৌসুমি বন্যার মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশে এবারের দুর্যোগ শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা এবং দুর্যোগ-প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৮টি উপজেলায় বন্যার প্রভাব পড়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন এবং ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন, যাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। বান্দরবানে ছয়জন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

সরকার এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করলেও সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। ফলে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখনও নিজ বাড়ি, উঁচু স্থান বা আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ভারী বৃষ্টির নতুন সতর্কতা

দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নতুন করে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে আরও ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। এতে নতুন এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ত্রাণের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলার জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু প্রায় ২৮ টাকা এবং পরিবারপ্রতি প্রায় ১০৬ টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্যোগের ব্যাপকতার তুলনায় এই বরাদ্দ প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য আরও বড় আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হবে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন চাপ

বন্যার প্রভাব কৃষি খাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধান এবং প্রায় দুই হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা। এছাড়া সবজি, পাট, আদা, হলুদ, মরিচ, ফলের বাগান ও পানের বরজও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আউশ ধানের ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হলেও পানি দ্রুত নেমে গেলে আমনের বীজতলা পুনরায় তৈরি করা সম্ভব। তবে চলতি বছর খাদ্য উৎপাদনের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও অবকাঠামোতেও বড় ক্ষতি

বন্যায় হাজার হাজার মাছের খামার ও পুকুর প্লাবিত হয়েছে। শুধু চট্টগ্রামেই মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ১০৯ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।

প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যুর পাশাপাশি পশুখাদ্য নষ্ট হওয়ায় খামারিরা নতুন সংকটে পড়েছেন। অন্যদিকে বান্দরবানে ভূমিধস ও বন্যায় প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পুনর্নির্মাণে কয়েক দশকোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তবতা আরও স্পষ্ট

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ঘন ঘন অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, টেকসই অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশলে আরও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।

এবারের বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।