এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ আগষ্ট ২০২৬ , ১০:৩৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

কানাডায় কঠোর অভিবাসন নীতি: ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশিরা

বিদেশি নাগরিকদের স্থায়ী বসবাস ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের দীর্ঘদিনের শিথিল অবস্থান থেকে সরে এসে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে কানাডা। অভিবাসন নীতির এই বড় ধরনের পরিবর্তনের ধাক্কায় দেশটিতে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি এখন চূড়ান্ত বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশনের চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) অবিলম্বে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে হাতিয়ার করে গণহারে রাজনৈতিক আশ্রয় (রিফিউজি ফ্রেম) দাবি করা, মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন এবং ভিজিটর ভিসায় গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করার কারণে কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এখন অত্যন্ত কঠোরভাবে ফাইল যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। জাল নথি বা ভিত্তিহীন তথ্য ধরা পড়লেই কোনো ধরনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বহিষ্কারের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। কেবল কানাডাই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও একই কৌশলের আশ্রয় নেওয়ায় প্রায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক বৈধ ভিসা ব্যবস্থার ওপর।

সিবিএসএ-এর তালিকা ও ডিপোর্টেশনের পরিসংখ্যান

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির সর্বশেষ তথ্যমতে, ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া আনুষ্ঠানিক হিসাবে দেশটিতে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন ৯৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক। এই তালিকায় শীর্ষ থাকা বহিষ্কারযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

১. ২০২০ সালে কানাডা থেকে মোট ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

২. করোনা মহামারির কারণে মাঝে বহিষ্কারের গতি কিছুটা ধীর থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরই মধ্যে ২২৭ জন বাংলাদেশিকে চূড়ান্তভাবে ডিপোর্ট করা হয়েছে।

৩. বর্তমানে কানাডায় সব মিলিয়ে ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

৪. সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় থাকা এই মোট ৪১ হাজারের কাছাকাছি বিদেশি নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার ৬২২ জনই হলেন রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী বা রিফিউজি আবেদনকারী।

অন্যান্য দেশের অবস্থান ও সামগ্রিক চিত্র

কানাডা থেকে বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর এই কঠোর পদক্ষেপ কেবল বাংলাদেশের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো অভিবাসন ব্যবস্থার অনিয়ম বন্ধে একটি সার্বিক অভিযান চলছে। সিবিএসএ-এর তালিকা অনুযায়ী অন্যান্য দেশের চিত্রটিও বেশ বড়:

১. তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে ভারত; দেশটির মোট ৭ হাজার ৬৬৯ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানোর কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

২. তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো, দেশটির মোট ৬ হাজার ৫৬১ জন নাগরিক রয়েছেন বহিষ্কারের অপেক্ষায়।

৩. এছাড়া তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ১৭৯ জন, চীনের ১ হাজার ৮৯২ জন, নাইজেরিয়ার ১ হাজার ৬৪৭ জন এবং পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩৯ জন নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম চলছে।

পটপরিবর্তন ও আশ্রয়ের আবেদনের জটিল সমীকরণ

কানাডায় আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের আবেদনগুলো নিয়ে সম্প্রতি সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে। ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সংকট বর্তমানে মূলত দুটি রূপ ধারণ করেছে:

১. পুরনো আবেদনকারীদের অবস্থানগত সংকট: পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যেসব বাংলাদেশি রাজনৈতিক মামলা, হামলা ও নিপীড়নের আশঙ্কা দেখিয়ে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন, দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসায় তাদের পুরনো যুক্তির সত্যতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে কানাডার অভিবাসন আদালত।

২. নতুন আবেদনকারীদের কৌশলী দাবি: ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে অথবা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে ফিরলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও শারীরিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন—এমন দাবি তুলে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি নতুন করে রিফিউজি আবেদন করছেন।

সহজ কথায়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও রূপান্তরকে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস করার একটি বড় হাতিয়ার বা ‘শর্টকাট কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকেই। এমনকি ভিজিটর ভিসায় ভ্রমণ করতে গিয়ে কিংবা ক্রীড়া ইভেন্ট দেখতে গিয়েও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। কানাডা ইমিগ্রেশনের এক তথ্যে দেখা যায়, ভিজিটর ভিসায় যাওয়া আবেদনকারীদের প্রতি ১৭৫ জনের মধ্যে অন্তত ১০ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।

ইউরোপেও একই চিত্র: ৯৭ শতাংশ আবেদনই নাকচ

বাংলাদেশিদের এই অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয় প্রার্থনার কৌশল শুধু কানাডাতেই সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপের দেশগুলোতেও পরিস্থিতি একই রকম উদ্বেগজনক। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (EUAA) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী:

১. ইউরোপের দেশগুলোতে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ তালিকার চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

২. এক বছরেই ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে জমা পড়েছে ৩৬ হাজার ১টি আশ্রয়ের আবেদন।

৩. বছর শেষে ইউরোপের বিভিন্ন আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে ছিল ৪১ হাজারের বেশি বাংলাদেশির আবেদন।

৪. তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসছে চূড়ান্ত ফলাফলে; হাজার হাজার আবেদনের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করেছে বা স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে। অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি আশ্রয় প্রার্থীর আবেদন সরাসরি ভিত্তিহীন হিসেবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পথ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অবক্ষয়

একটি বড় অংশ এখনো ভূমধ্যসাগরীয় বিপজ্জনক রুট দিয়ে অবৈধ মানবপাচারকারীদের সহায়তায় ইউরোপ ও উন্নত দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর স্থায়ী হওয়ার জন্য রাজনৈতিক নিপীড়নের মিথ্যা গল্প ও ভুয়া নথিপত্র তৈরি করা হচ্ছে।

সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজনৈতিক আশ্রয় কোনো দেশের ব্যক্তিগত বা দ্বিপাক্ষিক সুপারিশের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতাভুক্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া। তবে উন্নত দেশগুলোতে গিয়ে গণহারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর অভিবাসন কর্তৃপক্ষ অত্যাধুনিক ডেটাবেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি আবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করছে। ফলে সামান্য মিথ্যা বা গরমিল ধরা পড়ার সাথে সাথেই আবেদন বাতিল হয়ে যাচ্ছে এবং ডিপোর্টেশনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।

সাধারণ ও বৈধ আবেদনকারীদের ওপর মারাত্মক প্রভাব

এই ধরনের অসদুপায় ও ভিত্তিহীন আশ্রয় প্রার্থনার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ও প্রকৃত আবেদনকারীদের।

১. উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থী ভিসা: যারা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চাইছেন, তাদের ফাইলগুলোতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে এবং ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

২. দক্ষ কর্মী ও ওয়ার্ক পারমিট: বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ও চাকরির সুযোগ নিয়ে যারা যেতে চান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামগ্রিক আস্থার ঘাটতি তৈরির কারণে তাদের ফাইল প্রসেসিং সময় ও জটিলতা বহু গুণ বেড়ে গেছে।

৩. পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা: বাংলাদেশ থেকে সাধারণ পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রেও পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো এখন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

কানাডা থেকে ৯৬৮ জন বাংলাদেশিকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর এই সিদ্ধান্তটি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক উন্নত দেশগুলোতে স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এবং অবৈধ পথে প্রবেশের দিন এখন অনেকটাই শেষ হয়ে এসেছে। মিথ্যা আশ্রয়ের আবেদন ও নথিপত্র ব্যবহারের ফলে সাময়িকভাবে হয়তো কিছুদিন থাকা সম্ভব হচ্ছে, তবে শেষ পর্যন্ত তা কেবল দেশে ফেরত আসা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়িয়ে তুলছে।

বৈধ পথে সঠিক নিয়ম মেনে এগিয়ে না গেলে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের স্বপ্ন একপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে রূপ নেবে।