মোহাম্মদ তুহিন

প্রকাশিত: ১৪ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:৩৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

হরমুজ সংকটে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অচলাবস্থা ও মার্কিন বাহিনীর অন্তর্দশা

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এক নজিরবিহীন কৌশলগত অচলাবস্থায় এবং বহুমুখী সংকটে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। একদিকে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই কেবলমাত্র হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার শর্তে সংঘাতের ইতি টানার গোপন তৎপরতা ও নমনীয়তার ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে একই রণক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে তৈরি হয়েছে তীব্র মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়।

দীর্ঘ প্রায় নয় মাস ধরে সাগরে মোতায়েন থাকা এবং টানা ২৫০ দিন মাটির স্পর্শ না পাওয়া মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ চরম খাদ্য সংকট, মৌলিক রসদের অভাব এবং তীব্র মানসিক অবসাদে নাবিকদের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার মতো ঘটনা মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের শারীরিক ও মানসিক চরম ক্লান্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন এক বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক আত্মঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

লক্ষ্যহীন যুদ্ধ ও হোয়াইট হাউসের কৌশলী পশ্চাদপসরণ

চলমান সংঘাতের সূচনালগ্নে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যে কঠোর রণকৌশল ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সংঘাতের শুরুতে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে, দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বলয় স্থায়ীভাবে নির্মূল করা হবে।

তবে সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক তথ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের গোপন নথির বরাতে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, কোনো আনুষ্ঠানিক কিংবা স্থায়ী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ছাড়াই তিনি এই যুদ্ধ বন্ধ করতে প্রস্তুত। এই সমঝোতার পেছনে ওয়াশিংটনের একমাত্র বড় দাবি বা শর্ত হিসেবে রাখা হচ্ছে—বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ ইরানকে পুরোপুরি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে হবে।

যেখানে একটি পরাশক্তি আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি কাবু করতে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেখানে কয়েক মাস পর কেবল একটি নৌপথ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় ও অবস্থানগত অবমূল্যায়ন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এটি কোনো বিজয়ী শক্তির শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ভাষা নয়; বরং যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা অর্জন করতে না পেরে রাজনৈতিকভাবে মুখ রক্ষার জন্য মানদণ্ড নিচে নামিয়ে আনার একটি কৌশল। ট্রাম্প নিজেই সম্প্রতি গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতিকে কিছুটা শান্ত করতে ইরানের সাথে ‘আধা-আলোচনা’ (semi-negotiating) চালিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজয়ের বয়ান বনাম যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা

রাজনৈতিকভাবে ঘরের মাঠে অবস্থান ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব নিয়মিতভাবে প্রকাশ্য জনসভায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ের দাবি করে আসছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘাত চলাকালীন সময়ে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব শতাধিকবার দাবি করেছে যে ইরানকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস বা পরাজিত করা হয়েছে।

তবে আধুনিক যুদ্ধ কেবল বিবৃতির মাধ্যমে জেতা যায় না; তার প্রমাণ মিলছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায়। মনোবিজ্ঞানে একটি বহুল পরিচিত তত্ত্ব রয়েছে—‘স্লিপার ইফেক্ট’ (Sleeper Effect), যেখানে একটি অসত্য বা অতিরঞ্জিত তথ্যকে বারবার পুনরাবৃত্তি করলে সাধারণ মানুষের কাছে তা একপর্যায়ে সত্য বা প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে প্রতীয়মান হতে শুরু করে। রাজনৈতিক ময়দানে ট্রাম্প প্রশাসন এই কৌশলটি প্রয়োগের চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সামরিক সমীকরণে এটি কার্যকর হচ্ছে না।

বাস্তবতা হলো:

১. ইরানের শাসন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব: সংঘাত সত্ত্বেও তেহরানের শীর্ষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো অটুট রয়েছে।

২. ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা: ইরানের ড্রোন ও মিসাইল মজুদ সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, বরং তা এখনো মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিদ্যমান।

৩. আঞ্চলিক প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা থেমে যায়নি।

৪. পারমাণবিক অচলাবস্থা: পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।

ফলস্বরূপ, সামাজিক মাধ্যমে ঘোষিত বিজয়ের সঙ্গে ভূমির বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

তেহরানের কঠোর মনোভাব ও পাল্টাশর্তের চাপ

হোয়াইট হাউস যখন যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ (Off-ramp) খুঁজছে, তখন তেহরান কোনো ধরনের নমনীয়তা না দেখিয়ে তাদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সিনিয়র কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদ হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির জন্য একগুচ্ছ কঠিন পূর্বশর্ত দিয়েছেন।

ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান। অর্থাৎ পারস্য উপসাগর ও সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর জারি করা সমস্ত সামরিক অবরোধ নিঃশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের চারপাশের জলসীমা, আকাশসীমা ও আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো থেকে সকল মার্কিন সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম অবিলম্বে সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া চলমান যুদ্ধ এবং পূর্ববর্তী সংঘাতসমূহে ইরানের সামরিক, অর্থনৈতিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ওয়াশিংটনকে দিতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত সকল আন্তর্জাতিক ও একতরফা মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা সমস্ত ইরানি সম্পদ নিঃশর্তে অবমুক্ত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

এই শর্তাবলি কোনো পরাজিত বা কোণঠাসা রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের ভাষা নয়; বরং এটি এমন একটি দেশের রণকৌশল যা মনে করে যে ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে তাদের হাতে এখনো কার্যকর চাপ প্রয়োগের মতো তুরুপের তাস রয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনায় অগ্রগতির কথা বললেও তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের কোনো সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা চলছে না। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেবল জরুরি কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান করা হচ্ছে, যাকে কোনোভাবেই দ্বিপাক্ষিক শান্তি সংলাপ বলা চলে না।

সমুদ্রবক্ষে মার্কিন বাহিনীর বিপর্যয়: ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অন্তর্দশা

ভূ-রাজনৈতিক এই অচলাবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার ও করুণ দিকটি ফুটে উঠেছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর সুপারক্যারিয়ার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর অভ্যন্তরে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ধরে রাখতে গিয়ে মার্কিন সেনাসদস্যদের যে চূড়ান্ত সীমার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে।

টানা ২৫০ দিন সাগরে: এক নজিরবিহীন মানসিক যন্ত্রণা

সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলো ছয় থেকে সাত মাসের জন্য অভিযানে যায় এবং মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের বন্দরে রসদ সংগ্রহ ও নাবিকদের বিশ্রামের জন্য নোঙর করে। তবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্যকে একটানা ৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে টানা ২৫০ দিন তারা কোনো ভূমিতে পা রাখার সুযোগ পাননি—যা আধুনিক নৌ-অভিযানের ইতিহাসে এক চরম ও নজিরবিহীন ঘটনা।

চরম রসদ সংকট ও খাদ্য ঘাটতি

রণতরীটিতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট। যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক পরিবেশের কারণে নিয়মিত রসদবাহী জাহাজের মাধ্যমে তাজা খাবার পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে জাহাজের নাবিকদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের জোগান বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বস্ত সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নাবিকদের দৈনিক খাবার নেমে এসেছে সামান্য আধাকাপ ভাত এবং দুটি রুটিতে (টরটিলা)। সাবান, টুথপেস্ট ও ডিওডোরেন্টের মতো মৌলিক ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে। সেই সাথে জাহাজের অভ্যন্তরীণ স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে; নষ্ট টয়লেট, ছত্রাকযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর গোসলখানা এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে গরম পানির কোনো সরবরাহ নেই।

আত্মহত্যার চেষ্টা ও মনস্তাত্ত্বিক ধস

চরম শারীরিক ক্লান্তি, পুষ্টিহীনতা এবং বাড়ি ফেরার অনিশ্চয়তা নাবিকদের মানসিক ভারসাম্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। বেশ কয়েকজন নাবিক গভীর সমুদ্রে রণতরী থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। তেরো বছর ধরে মার্কিন নৌবাহিনীতে বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করা এক অভিজ্ঞ সেনার ঘটনা সামনে এসেছে, যিনি মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে উদ্ধার করে বিশেষ মেডিকেল নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

পরিবারগুলোর হাহাকার এবং পেন্টাগনের দ্বিমুখী অবস্থান

সমুদ্রে চরম মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে থাকা সেনাসদস্যদের পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। জাহাজের নাবিকদের সাথে তাদের পরিবারের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন বললেই চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সামরিক পরিবারভিত্তিক কমিউনিটি পেজগুলোতে স্বজনরা তাঁদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন।

তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখেও পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুরুতে শীর্ষ মার্কিন প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব এই ধরনের সংকটকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে নৌবাহিনীর এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয় যে, রণতরীটিতে আত্মহত্যার চেষ্টা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কোনো বাড়তি বিস্তার লক্ষ্য করা যায়নি এবং সেনাসদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহায়তা রয়েছে।

নৌবাহিনীর এই দাবিকে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের প্রশ্ন—কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নৌবাহিনী দাবি করছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, যখন দিনের পর দিন মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে সেনাদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে?

মার্কিন কংগ্রেসে তোলপাড় ও কঠোর তদন্তের ঘোষণা

রণতরীর এই মানবেতর পরিস্থিতি এবং যুদ্ধ কৌশলের ব্যর্থতা নিয়ে মার্কিন ক্যাপিটল হিলেও তীব্র রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এবং চারবার ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক মেরিন কর্মকর্তা কংগ্রেসম্যান সেথ মৌলটন পুরো ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

কংগ্রেসম্যান মৌলটন পেন্টাগনের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, মার্কিন সেনারা অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করতে সক্ষম এবং তারা অতীতে দীর্ঘমেয়াদি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু সেই ত্যাগের জন্য মিশনের একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা থাকতে হয়, যা সেনারা বিশ্বাস করতে পারে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই যুদ্ধটি শুরু থেকেই একটি ব্যর্থ ও আত্মঘাতী পরিকল্পনা। এটি ইরানকে দুর্বল করার বদলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রকে পরিণত করেছে। কোনো সেনাই এমন একটি ভিত্তিহীন ও ব্যর্থ মিশনের অংশ হতে চায় না এবং উদ্দেশ্য হারিয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মনোবল ভেঙে পড়ে।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মার্কিন সেনাদের ক্ষেত্রে একটি আত্মহত্যার ঘটনাও গ্রহণযোগ্য নয়। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর লগবুক, অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য প্রতিবেদন এবং রসদ সরবরাহ সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: গোলাবারুদের ঘাটতি ও কৌশলগত ঝুঁকি

চলমান সংঘাত কেবল সেনাসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরই আঘাত হানেনি, বরং মার্কিন সামরিক রসদ ও সমরাস্ত্রের ভাণ্ডারকেও বিপজ্জনক মাত্রায় সংকুচিত করে ফেলেছে।

১. গোলাবারুদের ঘাটতি: মাসের পর মাস ধরে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইল এবং ভারী গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে পেন্টাগনের নিজস্ব মজুতে টান পড়েছে। মার্কিন শীর্ষ সামরিক জেনারেলরা ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে এই তীব্র মাত্রার অভিযান অব্যাহত রাখা অসম্ভব।

২. অনিশ্চিত রণকৌশল: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই ইরানের ওপর চরম বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি দেন, কিন্তু পরবর্তীতে তা কার্যকর করতে ব্যর্থ হন। আন্তর্জাতিক সামরিক পরিমণ্ডলে এই আচরণ ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

৩. নৌ-শক্তির অতিব্যবহার: বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত অঞ্চল (যেমন এশিয়া-প্যাসিফিক বা ক্যারিবীয় অঞ্চল) থেকে রণতরী ও ডেস্ট্রয়ার প্রত্যাহার করে মধ্যপ্রাচ্যে এনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসিয়ে রাখার ফলে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে মার্কিন উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

ইরানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো চূড়ান্ত সাফল্য ছাড়াই যুদ্ধ থামানোর এই মার্কিন উদ্যোগের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আসতে চলেছে।

উপসাগরীয় আরব দেশসমূহের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের রূপান্তর দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর ভরসা করে আসছিল। তবে ওয়াশিংটনের এমন ফলাফলহীন যুদ্ধ পরিচালনার পর হঠাৎ পিছু হটার লক্ষণ দেখে তারা নিজস্ব নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নীতি নতুন করে সাজাতে শুরু করেছে এবং অনেকেই তেহরানের সাথে সরাসরি সম্পর্ক উন্নয়নের পথ বেছে নিচ্ছে।

ইউরোপীয় মিত্রশক্তির দিকে তাকালে দেখা যায়, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো শুরু থেকেই এই যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও জ্বালানি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যহীন নীতি ও একতরফা পদক্ষেপ দেখে ইউরোপীয় মিত্ররা দৃশ্যত এখন নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে চলার নীতি গ্রহণ করছে।

অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্য আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কোনো পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই মার্কিন নৌবহরের অবরোধ শিথিল হলে বা সংঘাত থেমে গেলে ইরানের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থীরা এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে। একটি পরাশক্তির সরাসরি সামরিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে থাকার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার সবসময় একটি অদৃশ্য ইরানি চাপের মুখে থাকবে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

৯. বিশ্লেষকদের চোখে ভবিষ্যৎ গতিপথ

আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম নয় যেখানে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে জয় নিশ্চিত করা যায়। আধুনিক যুদ্ধ পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট কৌশল, পর্যাপ্ত রসদ, নিখুঁত লক্ষ্য এবং সৈন্যদের উচ্চ মনোবলের ওপর ভিত্তি করে।

ইরান যুদ্ধে এই উপাদানগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে:

১. ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত কোনো নিষ্পত্তিমূলক ফল আনতে পারেনি। এটি এখন একটি বিপজ্জনক চক্রে পরিণত হয়েছে—উত্তেজনা বৃদ্ধি, সাময়িক বিরতি, একতরফা বিজয়ের ঘোষণা এবং পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধি।

২. মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সামরিক রসদ ও সেনাসদস্যদের মানসিক সক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

৩. কৌশলগত লক্ষ্য বারবার পরিবর্তন করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিজেই তার দরকষাকষির অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে।

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ঘরের মাঠে রাজনৈতিক চাপ ও বিজয়ের দাবি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একদিকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মূল দাবি থেকে সরে এসে কেবল নৌপথ খোলার জন্য সমঝোতার আকুতি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন থাকা যুদ্ধজাহাজে খাদ্যহীন, ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সেনাদের আত্মহত্যার চেষ্টা—এই দুই বাস্তবতার মিলন মার্কিন সামরিক নীতির গভীর ক্ষতকেই বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে।

যুদ্ধ বন্ধ হোক বা না হোক, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত প্রমাণ করেছে যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন কোনো পরাশক্তিকে চূড়ান্ত বিজয় এনে দিতে পারে না; বরং তা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকেই ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়।