প্রকাশিত: ১৪ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) বা স্বরাষ্ট্র বিভাগ কর্তৃক অভিবাসী বহিষ্কার ত্বরান্বিত করার অজুহাতে ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১০টি পুরোনো বিমান কেনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা বা খোলা দরপত্র (no-bid contract) ছাড়াই নর্দার্ন ভার্জিনিয়াভিত্তিক ‘ডেডালাস অ্যাভিয়েশন কর্পোরেশন’ (Daedalus Aviation Corporation)-কে এই বিশাল আর্থিক চুক্তি প্রদান করা হয়।
বিভাগের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়েছিল, অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিমানের প্রয়োজন, তাই অন্য কোনো কোম্পানির প্রস্তাব যাচাই করার সময় তাদের কাছে ছিল না। তবে কেনাকাটার পর কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও বিপুল ব্যয়ে কেনা এই বহরের একটি বিমানও বহিষ্কার অভিযানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। উল্টো বিলাসবহুল বিজনেস জেট অন্য সংস্থাকে লিজ দেওয়া এবং যাত্রীবাহী বিমানগুলোকে লুইজিয়ানার বিমানবন্দরে অকেজো ফেলে রাখার তথ্য সামনে এসেছে।
কংগ্রেসের তদন্ত এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশেষ নথিপত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের এই অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
১. কেনাকাটার নেপথ্য ও ‘জরুরি প্রয়োজনের’ অজুহাত
গত বছরের শেষের দিকে (শরৎকালে) ডিএইচএস যখন ডেডালাস অ্যাভিয়েশনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন প্রাথমিকভাবে চুক্তির আকার কম থাকলেও পরবর্তীতে তা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে, ট্রাম্পের দ্বারা সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টি নোম বরখাস্ত হওয়ার পর ওকলাহোমার সাবেক রিপাবলিকান সেনেটর মার্কওয়েন মুলিন যখন স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে শপথ নেন, ঠিক সেই দিনই চুক্তির আকার এক লাফে ৩০৩ মিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে মোট ৪৬৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।
সরকারি কেনাকাটার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন মূল্যে মানসম্মত সেবা বা পণ্য নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ডিএইচএস এক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী ও সুনির্দিষ্ট জরুরি অবস্থা’ (unusual and compelling urgency) সংক্রান্ত আইনি ধারা প্রয়োগ করে সাধারণ নিয়ম এড়িয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা মহামারীর মতো সময়ে—যেখানে বিলম্ব ঘটলে রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক বা অন্য কোনো ক্ষতি হতে পারে—এই জরুরি ধারা প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু কোন ধরনের ‘মারাত্মক ক্ষতি’ এড়াতে এই কেনাকাটা জরুরি ছিল, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সংস্থাটি।
২. বিলাসিতা ও অকেজো বহরের বাস্তব চিত্র
বিপুল অর্থ খরচে কেনা ১০টি বিমানের ধরন ও বর্তমান ব্যবহারের চিত্র পর্যালোচনায় চরম বৈপরীত্য ও অপচয়ের প্রমাণ মিলেছে:
ভিআইপি ও বিলাসবহুল বিজনেস জেট (৩টি): কেনা ১০টি বিমানের মধ্যে ৩টি ছিল অত্যন্ত দামি ও বিলাসবহুল বিজনেস জেট। এর মধ্যে একটি বোয়িং ৭৩৭ লাক্সারি জেটকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এর আদলে রঙ করা হয়েছে। অন্য দুটি হলো ১৪ আসনবিশিষ্ট 'গালফস্ট্রিম' বিজনেস জেট। সংগ্রহের পরপরই বিভাগ এগুলোকে অন্য সংস্থায় লিজ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। একটি গালফস্ট্রিম জেট এফবিআই (FBI) পরিচালক কাস প্যাটেলের সফরের জন্য ১২ মাসের চুক্তিতে লিজ দেওয়া হয়েছে—যদিও এফবিআই-এর কাছে পরিচালকের ব্যবহারের জন্য নিজস্ব জেট ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। অন্য বোয়িং লাক্সারি জেটটি পেন্টাগনকে লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বাকি গালফস্ট্রিমটি ডিএইচএস তাদের নিজস্ব শীর্ষ কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য রেখে দিয়েছে।
যাত্রীবাহী বোয়িং ৭৩৭ বিমান (৭টি): বহরের বাকি ৭টি বিমান ছিল অপেক্ষাকৃত পুরোনো বোয়িং ৭৩৭ যাত্রীবাহী জেট, যা এভিয়েশন কোম্পানি ‘আভেলো এয়ারলাইন্স’ থেকে সংগৃহীত। মূল কথা ছিল এগুলো দিয়ে বহিষ্কার কার্যক্রম চালানো হবে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো মাসের পর মাস লুইজিয়ানার 'লেক চার্লস' বিমানবন্দরে পার্ক করে রাখা হয়েছে। ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ সরকারি নথিতে স্বীকার করা হয়েছে যে, এগুলো উড্ডয়ন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী ও জনবল স্বরাষ্ট্র বিভাগের কাছে নেই!
৩. রাজনৈতিক আঁতাত ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
রাজনৈতিক অনুদান ও চুক্তি লাভ: ডেডালাস অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান ড. উইলিয়াম ওয়াল্টার্স (সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা) ২০২৪ সালে তৎকালীন সাউথ ডাকোটার গভর্নর ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টি নোমের সমর্থক এক রাজনৈতিক ফান্ডে ১০,০০০ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ক্রিস্টি নোমের অধীনেই উইলিয়াম ওয়াল্টার্সের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশত্যাগে উৎসাহিত করার জন্য প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের পৃথক চুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা: অনিয়ম সামনে আসার পর স্বরাষ্ট্র বিভাগ দায় ঠেলছে বরখাস্ত হওয়া সাবেক সচিব ক্রিস্টি নোমের ওপর। অন্যদিকে নোমের প্রতিনিধি দাবি করছেন, নথিপত্রে নতুন সচিব মার্কওয়েন মুলিন আসার পরই চুক্তি চূড়ান্ত এবং ৩০৩ মিলিয়ন ডলার বাড়ানো হয়েছিল।
৪. আইস (ICE)-এর প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন বনাম অযৌক্তিক কেনাকাটা
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব বিমান না কিনে বেসরকারি চার্টার্ড ফ্লাইট, সামরিক বাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের বিমান ব্যবহার করে বহিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে 'ICE Air' নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ২৫,৮০০টি চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ২৫টিরও বেশি বিমান আকাশে থাকে।
বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় আইস (ICE)-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন স্যান্ডওয়েগ অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে মন্তব্য করেছেন:
"আমাকে যদি বহিষ্কারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আইস-এর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটি তালিকা তৈরি করতে বলা হতো, তবে নিজস্ব বিমান বহর কেনা সেই তালিকার শীর্ষ ১০টি বিষয়ের মধ্যেও স্থান পেত না।"
অর্থাৎ, ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে নিজস্ব বিমান কিনে তার রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মী পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া সম্পূর্ণ অহেতুক ও অযৌক্তিক একটি সিদ্ধান্ত ছিল।
৫. বিগত নীতি থেকে আকস্মিক পিছুটান: গুদাম থেকে বিমান
স্বরাষ্ট্র বিভাগের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও ক্রিস্টি নোম স্বরাষ্ট্র সচিব থাকাকালে আটককৃতদের রাখার জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচে বিশাল বিশাল গুদামঘর (Warehouse) কিনেছিল। কিন্তু মুলিন দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয় এবং এখন ওই গুদামগুলো বিক্রি করে দেওয়া বা অন্যকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে, সেনেট সদস্য প্যাটি মারে এবং ক্রিস্টোফার মারফিকে ডিএইচএস কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, কেনা বোয়িং বিমানগুলোর বেশিরভাগই আর বহিষ্কার কাজে ব্যবহৃত হবে না; বরং কংগ্রেস সদস্যদের বিদেশ সফরের জন্য এগুলো ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে!
গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ (In-depth Analysis)
স্বরাষ্ট্র বিভাগের এই ৪৬৪ মিলিয়ন ডলারের বিতর্কিত বিমান কেনাকাটা কেবল একটি একক কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সার্বিক দেউলিয়াত্বকে তুলে ধরে। বিস্তারিত বিশ্লেষণে প্রধান চারটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. 'জরুরি শিথিলতা' (Urgency Exemption)-র অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক অপব্যবহার
সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে দরপত্র এড়ানোর প্রবণতা এক আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে।
২০২৪ সালে ডিএইচএস-এর মোট চুক্তির ১ শতাংশেরও কম জরুরি ধারায় দেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ শতাংশে।
আর ২০২৬ সালে এসে এটি দাঁড়িয়েছে অভূতপূর্ব দুই-তৃতীয়াংশে (প্রায় ৬৬%)!
স্বরাষ্ট্র বিভাগ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মোট প্রায় ৫০০টি চুক্তিতে ২৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ 'জরুরি প্রয়োজন' দেখিয়ে কোনো দরপত্র ছাড়া বরাদ্দ দিয়েছে। সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ এবং নোমের ঘনিষ্ঠদের দেওয়া ২২০ মিলিয়ন ডলারের মিডিয়া প্রচারণার চুক্তিও এই দোহাই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক কেনাকাটা বিশেষজ্ঞ লরনা টেডারের মতে, "প্রতিটি কাজে যখন জরুরি অবস্থার দোহাই দেওয়া হয়, তখন সেটি সরাসরি দুর্নীতির রূপ নেয়।"
২. জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে তথ্য গোপন
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কেনাকাটার নিয়ম অনুযায়ী, কেন উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি তার আইনি ব্যাখ্যা (Rationale) জনসম্মুখে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্বরাষ্ট্র বিভাগ এই তথ্য প্রকাশ করতে সাফ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এই তথ্য প্রকাশ করলে "জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে।" কোনো সামরিক গোপন বিষয় না থাকা সত্ত্বেও কেবল করদাতাদের অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির তথ্য ঢাকতে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ শব্দবন্ধটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে প্রশাসন।
৩. রাজনৈতিক কোন্দল ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
চুক্তি সম্পাদনের তারিখ ও অর্থ বৃদ্ধির সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের চরম প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা স্পষ্ট হয়। ক্রিস্টি নোমকে বরখাস্ত করা এবং মার্কওয়েন মুলিনের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে তড়িঘড়ি করে ৩০৩ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, নীতিগত কোনো পরিকল্পনা ছাড়া কেবল বরাদ্দকৃত বাজেট খালি করার লক্ষ্যেই এই বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছে।
৪. করদাতার অর্থের সরাসরি অপচয় ও আইনি সংস্কারের দাবি
যেখানে এফবিআই-এর নিজস্ব ভিআইপি বিমান রয়েছে, সেখানে ডিএইচএস-এর কেনা বিলাস বিমান লিজ দেওয়া এবং যাত্রীবাহী বিমানগুলো লুইজিয়ানার টারমাকে অকেজো ফেলে রাখা স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় তহবিলের নয়ছয়। সেনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটি এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও তদন্ত দাবি করেছে।
জরুরি প্রয়োজন ও জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে দরপত্রহীন কেনাকাটার এই সংস্কৃতি মার্কিন সুশাসনের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। করদাতাদের শত শত কোটি ডলার যখন অকেজো বিমান বা পরিত্যক্ত গুদামঘরে অপচয় হচ্ছে, তখন এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নির্দেশ করে না, বরং মার্কিন রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ের নীতি ও স্বচ্ছতার চরম অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।