প্রকাশিত: ১৩ আগষ্ট ২০২৬ , ০১:৩৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনে তছনছ হয়ে যাওয়া গাজা উপত্যকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (Autism Spectrum Disorder) আক্রান্ত শিশু ও কিশোরেরা। একটানা বোমাবর্ষণ, মাথার ওপর যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং তীব্র ওষুধ সংকট—সব মিলিয়ে গাজার অটিজম আক্রান্ত শিশুদের দৈনন্দিন মানসিক ও শারীরিক জীবন এক চরম ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
গাজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩,৩৮০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ নিহত বা আহত হওয়ার খবর নিয়মিত সংবাদ শিরোনামে উঠে আসলেও, এই বিভীষিকার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারের বেঁচে থাকার নীরব ও মর্মান্তিক সংগ্রামের গল্প।
বোমার শব্দ ও সংবেদনশীলতার অভিঘাত (Sensory Overload)
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের মানসিক ও আবেগীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শান্ত পরিবেশ ও একটি সুনির্দিষ্ট দৈনন্দিন রুটিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গাজায় চলমান অনবরত বিস্ফোরণ ও গোলাগুলি তাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
১৬ বছরের আহমেদ হাতেম আল-মহাবিলের গল্প: খান ইউনিসের ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসবাসকারী ১৬ বছর বয়সী আহমেদ তার চিবুকের নিচে দু'হাত শক্ত করে চেপে ধরে রাখে। বোমার বিকট শব্দ থেকে নিজের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে সে বারবার এই আচরণটি করে। যুদ্ধের আগে আহমেদ বিশেষ শিক্ষকের তদারকিতে দারুণ উন্নতি করছিল—সে ফুটবল একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল, কোরআন মুখস্থ করছিল এবং ইংরেজিতে পারদর্শী হয়ে উঠছিল। কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় তার ঘরবাড়ি, স্কুল ও স্পোর্টস একাডেমি ধ্বংস হয়ে গেছে।
আতঙ্ক ও আত্মঘাতী প্রবণতা: আহমেদের মা উম্মে আহমেদ জানান, বিকট শব্দ শুনলেই আহমেদ তীব্র আতঙ্কে কান চেপে ধরে শরীর দোলাতে থাকে। ভয়ের মাত্রা চরমে পৌঁছালে সে মাটিতে মাথা আঘাত করে নিজেকে আহত করার চেষ্টা করে।
শারীরিক জটিলতা: মানসিক আঘাতের পাশাপাশি তীব্র পুষ্টিহীনতা ও প্রোটিনের অভাবে আহমেদের অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যায়। খাদ্যাভাব ও ক্ষত সংক্রমণের কারণে চিকিৎসকদের পেটে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।
ওষুধ সংকট ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় প্রয়োজনীয় উপশমকারী এবং মানসিক রোগের ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গাজার সেন্ট্রাল নুসরাত ক্যাম্পের ১৯ বছর বয়সী মুনীর আল-হাজের ক্ষেত্রেও এই সংকটের ভয়াবহ প্রভাব স্পষ্ট।
অর্ধেক ডোজে চিকিৎসা: যুদ্ধের আগে প্রদেয় চিকিৎসার মাধ্যমে মুনীরের চিত্রাঙ্কন ও যোগাযোগের দারুণ দক্ষতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বোমাবর্ষণ এবং ওষুধ সরবরাহের অভাবে সে এখন ভয়াবহ খিঁচুনি ও চিৎকার করার রোগে ভুগছে। ওষুধের সংকট এতটাই তীব্র যে, চিকিৎসকরা তার দৈনিক সেডেটিভ (উপশমকারী ওষুধ) কমিয়ে মাত্র অর্ধেক ট্যাবলেটে নামিয়ে এনেছেন।
মুনীরের বাবার আকুতি: মুনীরের বাবা জানান, "ও আগে পরিষ্কারভাবে নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারত, কিন্তু যুদ্ধ সব কেড়ে নিয়েছে। ও এখন এমন সব প্রশ্ন করে যার উত্তর আমাদের কাছে নেই। আমরা বলি 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন', কিন্তু সে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝে এবং আর্তনাদ করে বলে—'আমার কোনো আশ্রয় বা জন্মভূমি নেই'।"
স্নায়ু বিশেষজ্ঞদের মতামত ও স্বাস্থ্য খাতের পতন
মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ শিক্ষা খাতের কর্মীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অটিস্টিক শিশুদের চিকিৎসায় এ ধরনের আকস্মিক ছেদ তাদের মারাত্মক মানসিক রিবাউন্ড (Rebound effect)-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
স্নায়ু বিশেষজ্ঞ জিয়া আবু আউনের বিশ্লেষণ: "একজন অটিস্টিক শিশু নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট রুটিন ও শান্ত পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। বোমাবর্ষণের মধ্যে তাঁবুতে থাকতে বাধ্য হওয়ায় তাদের মস্তিষ্ক এক ধরনের সংবেদনশীল ধাক্কা (Sensory Shock) পায়, যা প্রক্রিয়াজাত করা মস্তিষ্কের পক্ষে অসম্ভব। এই ভয় তাদের অনিদ্রা, হজমের সমস্যা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া চিৎকার বা ক্ষোভের জন্ম দেয়।"
চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কেন্দ্রের বিনাশ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য মতে, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় কোনো ধরনের পুনর্বাসন সরঞ্জাম প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গাজার ঐতিহ্যবাহী 'ফিলিস্তিন সেন্টার ফর স্পেশাল এডুকেশন' কেন্দ্রটি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর পরিচালক আরিজ আবু সুলতান নিহত হয়েছেন।
রুটিনের গুরুত্ব: গাজার ডলফিনস অ্যাসোসিয়েশনের অটিজম কর্মসূচির প্রধান রিম জারুর বলেন, "অটিস্টিক শিশুদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ একটি স্নায়বিক নিরাপত্তা প্রদান করে। বারবার বাস্তুচ্যুতির কারণে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা তাদের সামাজিক ও ভাষাগত দক্ষতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।"
একটি মানবিক আবেদন
গাজার অটিস্টিক শিশুদের পরিবারগুলো আজ সম্পূর্ণ একাকী ও অসহায়। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়া কেবল ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অভিভাবকেরা সন্তানদের সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
আহমেদের মা উম্মে আহমেদের আকুল আবেদন—"আমাদের একমাত্র আশা, আহমেদ যেন বিদেশে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের একটি সুযোগ পায়, যাতে যুদ্ধ তার কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে, তা সে কিছুটা হলেও ফেরত পেতে পারে।"
গাজার এই মানবিক সংকট কেবল অবকাঠামো বা জীবনের ক্ষতি নয়, এটি একটি পুরো প্রজন্মের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মানসিক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর এক স্থায়ী ও কালো দাগ রেখে যাচ্ছে।
গাজার যুদ্ধ, অটিজম ট্র্যাজেডি ও আন্তর্জাতিক মানবিক দায়বদ্ধতা
গাজায় চলমান যুদ্ধ কেবল বস্তুগত বিনাশ কিংবা প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় অস্তিত্বকে এক অলিখিত মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা ও ভবিষ্যতের প্রভাব বোঝার জন্য কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা বিশ্লেষণ করা জরুরি:
১. কাঠামোগত চিকিৎসাব্যবস্থা ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
একটি সমাজে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণ নির্ভর করে একটি সুরক্ষিত 'ইকোসিস্টেম' বা সহায়ক কাঠামোর ওপর। গাজায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া চিকিৎসাসামগ্রী আটকে রাখা, 'ফিলিস্তিন সেন্টার ফর স্পেশাল এডুকেশন'-এর মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যু সেই কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, বছরের পর বছর ধরে থেরাপির মাধ্যমে অর্জিত শিশুদের ভাষাগত ও সামাজিক বিকাশ মুহূর্তেই শূন্যে এসে ঠেকেছে।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অলিখিত জেনোসাইডাল প্রভাব:
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যুদ্ধের আঘাত বা ট্রমা সামলে ওঠা কঠিন হলেও, অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের শব্দ ও আলো সরাসরি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে 'সেন্সরি ওভারলোড' তৈরি করে। গাজায় কোনো নিরাপদ বা শান্ত স্থান অবশিষ্ট না থাকায় এই শিশুরা ২৪ ঘণ্টা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওষুধ ও থেরাপির অভাবে এই যন্ত্রণা পরবর্তীতে অনিরাময়যোগ্য মানসিক প্রতিবন্ধকতা, তীব্র খিঁচুনি ও স্ব-আঘাতের মতো মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।
৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা:
জাতিসংঘের 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন' (UN CRPD)-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধ ও জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি মৌলিক দায়িত্ব। গাজায় অটিস্টিক শিশুদের প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং পুনর্বাসন সরঞ্জাম প্রবেশের সুযোগ না দেওয়া স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের চরম লঙ্ঘন।
গাজার অটিস্টিক শিশুদের এই নিশব্দ চিৎকার আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। অবিলম্বে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা দল পাঠানো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং বিশেষায়িত ঔষধ সরবরাহ সুগম না করা হলে, একটি পুরো প্রজন্মের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা চিরতরে স্বাভাবিক জীবনের অধিকার হারিয়ে ফেলবে।