প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম সবচেয়ে নাজুক অবস্থানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তাদের মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কারকে টেকসই করতে সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে এসব মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। গণমাধ্যমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়।
সংলাপে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থার প্রভাব ও করপোরেট মালিকানার আধিপত্য স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে আরও দুর্বল করেছে।
তিনি বলেন, অনেক গণমাধ্যম মালিক সংবাদমাধ্যমকে জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা না করে নিজেদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থাও কমে যাচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করেন, প্রকৃত বিপ্লব তখনই ঘটে যখন রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় দৃশ্যমান ও স্থায়ী পরিবর্তন আসে। মানুষের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও সেই কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বর্তমান প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ছাড়া গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
তিনি সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সাংবাদিক অনিশ্চিত চাকরি ও অপ্রতুল বেতনের মধ্যে কাজ করছেন। তাদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং মালিকপক্ষের অযৌক্তিক চাপ থেকে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
মাহমুদা হাবিবার মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাজনৈতিক দল, সরকার ও গণমাধ্যমকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, সংস্কারের নামে দীর্ঘসূত্রতা জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। জনগণ জানতে চায়, জুলাই সনদ কবে বাস্তবায়িত হবে এবং জাতীয় নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে। সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের মতো দীর্ঘদিনের সংস্কারও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এজন্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, গণমাধ্যম পরিচালনা ও চর্চায় মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন।
সংলাপে বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এ সময়ে স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর।