কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০২:৩৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

পড়শির শিক্ষা কি গ্রহণ করবে ভারত

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে ভিন্ন ভিন্ন কারণে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও অর্থনৈতিক বিপর্যয়, কোথাও চাকরি ও বৈষম্যের প্রশ্ন, কোথাও দুর্নীতি, রাজনৈতিক পরিবারের বিলাসিতা ও নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন আন্দোলনের প্রাথমিক কারণ ছিল। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি ছোট দাবি বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরকারবিরোধী গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

এখন সেই রাজনৈতিক বাতাস ভারতের দিকেও বইছে। ভারতের সাম্প্রতিক যুব আন্দোলন শুরু হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মকে কেন্দ্র করে। পরে তা বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং সরকারের কঠোর আচরণের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষে পরিণত হয়। আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন এবং আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হয়েছে মোদী সরকারকে। নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ শাসনামলে জনবিক্ষোভের মুখে এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক ছাড় বিরল ঘটনা।

এই ঘটনাকে শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংকট হিসেবে দেখলে ভারতের শাসকগোষ্ঠী বড় ভুল করবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গমাত্র। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা, সামাজিক অগ্রগতির পথ সংকুচিত হয়ে আসার আশঙ্কা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার দুর্বলতা। ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সব তরুণের কর্মসংস্থান ও নিরাপদ ভবিষ্যতে রূপান্তরিত হচ্ছে না। সর্বশেষ আন্দোলনে সেই অসন্তোষই রাস্তায় প্রকাশ পেয়েছে। (Reuters⁠)

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলও মোদী সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা ছিল। বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনে সরকার গঠন করতে বাধ্য হয়। ভোটাররা মোদীকে তৃতীয় মেয়াদ দিলেও তাঁকে আগের মতো সীমাহীন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দেয়নি। শক্তিশালী বিরোধী দল, জোটনির্ভর সরকার এবং সক্রিয় আঞ্চলিক রাজনীতি ভারতের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। (The Print⁠)

ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সীমিত আন্দোলন প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, প্রাণহানি ও আন্দোলনকারীদের অবমাননা সেই সীমিত দাবিকে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ দিয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

শ্রীলঙ্কার শিক্ষা কিছুটা ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র এবং বাস্তবতা অস্বীকারের রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। জনগণ যখন জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটে পড়ে, তখন জাতীয়তাবাদী বক্তৃতা কিংবা অতীতের নির্বাচনী বিজয় সরকারকে রক্ষা করতে পারেনি। নেপালেও দুর্নীতি, শাসকশ্রেণির আত্মতুষ্টি এবং তরুণদের ক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক দলের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকে না। তারা নিজেরাই আন্দোলনের ভাষা, নেতৃত্ব ও সংগঠন তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশের অভিজ্ঞতায় দুর্বল অর্থনীতি, ক্ষয়িষ্ণু প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন এবং দমনমূলক প্রতিক্রিয়ার একটি অভিন্ন যোগসূত্র দেখা গেছে।

মোদী সরকার কিছু শিক্ষা যে গ্রহণ করেছে, সাম্প্রতিক ছাড় ও সংস্কারের ঘোষণায় তার ইঙ্গিত রয়েছে। আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ গ্রহণ এবং পরীক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ রাজনৈতিক নমনীয়তার পরিচয়। কিন্তু এটি সত্যিকার শিক্ষা, নাকি সাময়িক চাপ সামলানোর কৌশল, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

ভারতের জন্য প্রয়োজন শুধু পরীক্ষার নিরাপত্তা বৃদ্ধি নয়। প্রয়োজন নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, বেকারত্ব মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষা করা। সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তাও ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

ভারত শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপাল নয়। তার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক শক্তি, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। তাই ভারতের সামনে এখনো ভুল সংশোধনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বড় রাষ্ট্র হওয়ার অর্থ এই নয় যে জনঅসন্তোষ তাকে স্পর্শ করবে না। বরং বৃহৎ জনসংখ্যা, বিপুল যুবসমাজ এবং গভীর সামাজিক বৈচিত্র্যের দেশে ছোট ক্ষোভও দ্রুত বৃহৎ সংকটে রূপ নিতে পারে।

পড়শির ঘরে আগুন লাগলে শুধু জানালা বন্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আগুন কেন লেগেছে, নিজের ঘরে সেই একই দাহ্য উপাদান জমেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হয়। মোদী সরকারের সামনে এখন সেই আত্মপরীক্ষার সময়। প্রতিবেশীদের পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারত গণতান্ত্রিক সংশোধনের পথে যাবে, নাকি নির্বাচনী সাফল্যের আত্মতুষ্টিতে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবে, ভারতের আগামী রাজনীতির গতিপথ সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।