ফাতিমা খানম

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৪৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

অটোরিকশার অব্যবস্থাপনায় শহুরে জনজীবন বিপর্যস্ত

বাংলাদেশের শহরগুলো আজ উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বহুতল ভবন, উড়ালসেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও আধুনিক অবকাঠামো নগরায়ণের দৃশ্যমান চিত্র তুলে ধরছে। কিন্তু উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি সমস্যা প্রতিনিয়ত নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলছে—তা হলো তীব্র যানজট। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে কর্মঘণ্টা, অর্থ এবং মানসিক প্রশান্তি হারাচ্ছেন। এই সংকটের পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অটোরিকশা নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় গণপরিবহন। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত, অলিগলি কিংবা এমন এলাকায় যেখানে বড় যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে না, সেখানে এটি মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। হাজার হাজার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবিকা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তাই অটোরিকশাকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিবহন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু যখন এই যানবাহন পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হয়, তখন তা জনসাধারণের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ শহরে দেখা যায়, অটোরিকশা চালকদের একটি বড় অংশ নির্ধারিত স্ট্যান্ড ব্যবহার না করে রাস্তার মোড়ে, বাজারের সামনে, হাসপাতালের প্রবেশপথে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেটে যাত্রী ওঠানামা করান। এতে চলন্ত যানবাহনের গতি হঠাৎ কমে যায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আবার অনেক চালক যাত্রী পাওয়ার আশায় সড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশে হঠাৎ মোড় নেন, উল্টো পথে যান কিংবা ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করেন। এসব অনিয়ম পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলে।

যানজটের সবচেয়ে বড় শিকার হন সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষায় দেরি করে, ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের সুযোগ হারান, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকে। একটি শহরের উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার পরিবহন ব্যবস্থার ওপর। যানজটের কারণে প্রতিদিন যে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়।

তবে এ সমস্যার জন্য কেবল অটোরিকশা চালকদের দায়ী করাও সঠিক হবে না। অনেক শহরে গণপরিবহনের সংকট রয়েছে। বাসের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, অনেক রুটে মানসম্মত গণপরিবহন নেই, ফুটপাত দখল হয়ে আছে, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে নেই এবং যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্থানও পর্যাপ্ত নয়। ফলে অটোরিকশা চালকেরা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যাত্রী সংগ্রহের জন্য অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। অর্থাৎ সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, বরং পুরো পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।

অন্যদিকে, অনেক অটোরিকশা যথাযথ নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করে। চালকদের একটি অংশ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কেও সচেতন নন। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই এবং কঠোর তদারকির অভাবে আইন ভঙ্গের প্রবণতা বাড়ছে। অনেক সময় আইন প্রয়োগে অসঙ্গতি থাকায় অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, যা অন্যদেরও একই পথে উৎসাহিত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে বা জরিমানা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর পরিবহন নীতি। কোন এলাকায় কতসংখ্যক অটোরিকশা চলবে, কোন রুটে চলাচলের অনুমতি থাকবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে এবং কোথায় স্ট্যান্ড থাকবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল, ডিজিটাল মনিটরিং, সিসিটিভি নজরদারি এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।

বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে ছোট আকারের গণপরিবহনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এনে পরিচালিত করা হয়েছে। ফলে জনগণও সুবিধা পাচ্ছে, আবার যানজটও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাংলাদেশেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। উন্নয়ন মানেই কোনো একটি পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং সব ধরনের পরিবহনকে একটি কার্যকর ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা।

নাগরিকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেকেই নিজের সুবিধার জন্য যেখানে-সেখানে গাড়ি থামাতে বলি, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করি কিংবা ট্রাফিক আইনকে গুরুত্ব দিই না। এই ছোট ছোট অনিয়মই বড় যানজটের জন্ম দেয়। তাই সড়ক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে হলে চালক, যাত্রী এবং পথচারী—সবার মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অটোরিকশা চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্মাণ, ডিজিটাল নিবন্ধন, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা একসঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত গণপরিবহন বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত বা ছোট যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়।

যানজট কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ফলে জ্বালানির অপচয় বাড়ে, বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পায়, শব্দদূষণ তীব্র হয় এবং মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন নাগরিকরা নিরাপদ, দ্রুত ও স্বস্তির সঙ্গে চলাচল করতে পারেন।

অটোরিকশা আমাদের নগর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই পরিবহনকে দোষারোপ করে নয়, বরং সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনবান্ধব করে তুলতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহনের উন্নয়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই যানজট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একটি সভ্য শহরের পরিচয় শুধু উঁচু দালান বা প্রশস্ত সড়কে নয়; বরং সেই শহরের মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল, সময়ের মূল্যায়ন এবং সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত।

"পরিকল্পিত পরিবহনই পারে যানজটমুক্ত শহর গড়তে; আর শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক আচরণই পারে সেই পরিকল্পনাকে সফল করতে।"