সাঈদ উজ্জ্বল

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬ , ১০:৫৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

রামিসার রায়: রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র উনিশ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গত ১৯ মে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। ২১ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি নিহত শিশুটির বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস প্রদান করেন। তদন্তকারী সংস্থা মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করে এবং সব আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ৭ জুন আদালত রায় ঘোষণা করে। রাষ্ট্রের দ্রুত তৎপরতা এবং স্বল্প সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আশার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতা, মামলা জট ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতায় ক্লান্ত মানুষের কাছে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই দেখা দিয়েছে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো আলোচিত এই ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট কি সত্যিই দূর হয়েছে? দ্রুত বিচার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কেবল দ্রুততার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবার বছরের পর বছর ঝুলে থাকা বিচারও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রয়োজন এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যেখানে বিচার হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।


১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ষষ্ঠভাগে বিচার বিভাগের কাঠামো ও নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৯৪ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে বিচারকদের স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক ভাষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব বরাবরই রয়ে গেছে। বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুরু থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি বিচারক নিয়োগ দিলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। ফলে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা কখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।


বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা কিংবা বিচার বিভাগীয় চাকরিতে নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ করলেই বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, কিন্তু সেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিতা নেই। যোগ্যতা ও উপযুক্ততার চূড়ান্ত নির্ধারণ কার্যত রাজনৈতিক সরকারের হাতে নির্ভরশীল। বিচারক অপসারণের প্রশ্নেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে। সংসদের মাধ্যমে অপসারণ নাকি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অপসারণ, এই বিতর্ক মূলত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বকেই সামনে আনে।


সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকার বলছে, অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে পরে আইন প্রণয়ন করা হবে এবং তারা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে এসব বক্তব্যের বাস্তব রাজনৈতিক গুরুত্ব সীমিত থেকে যায়। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। সেটি বাতিল হওয়ায় অনেকে মনে করছেন, বিচার বিভাগ আবারও নির্বাহী প্রভাবের পুরনো কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।


বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার আরেকটি গভীর সংকট এর ঔপনিবেশিক ভিত্তি। দেশের আদালত ব্যবস্থা এখনো মূলত ব্রিটিশ আমলের দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও দেওয়ানি কার্যবিধির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির মূল উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশিক শাসনকে টিকিয়ে রাখা এবং শাসিত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সেই কাঠামোকে মৌলিকভাবে পুনর্বিবেচনা করেনি। ফলে বিচার প্রক্রিয়া এখনো জটিল, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ। দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য বিচার পাওয়া প্রায়শই হয়ে ওঠে দুরূহ ও ক্লান্তিকর এক অভিজ্ঞতা।


 বহু আলোচিত অপরাধের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তদন্তে বিলম্ব ঘটে, সাক্ষ্যগ্রহণ দীর্ঘ হয়, আর আইনের ফাঁক গলে অপরাধীরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে। ফলে জনগণের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট বাড়তে থাকে। রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার তাই যেমন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি একই সঙ্গে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো, আলোচিত এই ঘটনাতে রাষ্ট্রের এমন তৎপরতা দেখা গেলো, অথচ অসংখ্য সাধারণ মানুষের বিচার বছরের পর বছর অপেক্ষার মধ্যে আটকে থাকে সেগুলোর কি হবে?


বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রতি অনীহা। যে দলই ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা নির্বাচন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এক ধরনের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীন হয়ে পড়ে। অথচ একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নাগরিকের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার প্রশ্ন।


রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থা। বিচার বিভাগ সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু যখন বিচার ব্যবস্থা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নও ক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়। কোন ঘটনা দ্রুত বিচার পাবে, কোন মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে, কোন অপরাধ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার পাবে আর কোনটি উপেক্ষিত হবে, এসবই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার রাজনৈতিক চরিত্রকে উন্মুক্ত করে। ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন আইনি বা প্রশাসনিক সংস্কারের সাথে সাথে এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণেরও প্রশ্ন।


জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল, তার কেন্দ্রে রয়েছে পুরনো নিপীড়নমূলক এবং অকার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলের দাবি। তারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনব্যবস্থার চরিত্রগত পরিবর্তন চায়। যদি রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিএনপি, এই আকাঙ্ক্ষার গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় এবং পুরনো ক্ষমতার রাজনীতিকেই অব্যাহত রাখে, তবে সেটি তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক ভুল হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন প্রজন্ম কার্যকর প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক মর্যাদার বাস্তব নিশ্চয়তা চায়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কারের প্রশ্ন তাই এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন এখন এটিই।


লেখক: কবি ও রাজনীতিবিদ