-
🇧🇩
বাংলা মূল ভাষা (Original)
-
🇺🇸
English English
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একছত্র ও কঠোর শাসন ব্যবস্থার যেভাবে পতন ঘটেছে, তাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা এখন ‘বাংলাদেশী ফর্মুলা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ভারতের সীমান্তবর্তী এই ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ক্ষমতার এমন আকস্মিক ও নাটকীয় রদবদল পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র গুঞ্জন, ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের কট্টর নীতি এবং পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইরত দুই দেশের বিরোধী শিবির ও আন্দোলনকারীরা গোপনে এই ‘বাংলাদেশী ফর্মুলা’
আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু পরমাণু শক্তিধর দুই প্রধান প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে এই মডেল কতটা কার্যকর হতে পারে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বড় কোনো ভূরাজনৈতিক ভূতুড়ে খেলা?
ভারতের উদ্বেগ: ব্যালট নাকি ‘বাংলাদেশী স্টাইল’ গণঅভ্যুত্থান?
সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) প্রধান মোহন ভাগবতসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাধিকবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী কিরণ রিজিজুও সম্প্রতি প্রকাশ্য বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন যে, বাংলাদেশে যেভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ক্ষমতার পরিবর্তন করা হয়েছে, ভারতের যুবসমাজকে উসকে দিয়ে ঠিক একই ধাঁচের একটি চক্রান্ত তৈরির অপচেষ্টা চলছে।
ভারতের বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আঞ্চলিক দলগুলো সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার হলেও, রাজপথের ক্ষোভকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ছাত্রদের রণকৌশলকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা, “ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশ বা ফ্রান্স নয় যে এখানে রাজপথের হিংসা দিয়ে সরকার ফেলে দেওয়া যাবে, ভারতের ক্ষমতা পরিবর্তন কেবল ব্যালট বক্সের মাধ্যমেই সম্ভব”। তা সত্ত্বেও, ভারতের কৃষক আন্দোলন বা সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিতে বাংলাদেশ মডেলের প্রভাব দেখছেন ভূরাজনীতিবিদরা।
পাকিস্তানের বাস্তবতা: ইমরান খানের দল কি ‘বাংলাদেশ মডেল’ অনুসরণ করছে?
পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভারতের চেয়েও বেশি জটিল ও বিস্ফোরক। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা এবং পর্দার আড়াল থেকে সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI) এর কট্টর সমর্থকেরা বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন থেকে চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা খুঁজছে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি এখন সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী দমনপীড়ন’ রুখতে সর্বাত্মক রাজপথ অববোধ ও নাগরিক অসহযোগ আন্দোলনের ছক কষছে, যা মূলত বাংলাদেশের ২০২৪ এর আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শক্তিশালী রাওয়ালপিন্ডি (সেনাবাহিনী) বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ধারণ করে, যার ফলে সেখানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছাড়া এই ফর্মুলা বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
কী এই ‘বাংলাদেশী ফর্মুলা’?
আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর মতে, এই ফর্মুলার প্রধান তিনটি উপাদান হলো:
১. অরাজনৈতিক নেতৃত্ব: প্রথাগত রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে ছাত্র বা সাধারণ তরুণদের আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে নিয়ে আসা।
২. সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রবাসীদের সক্রিয়তা: মূলধারার গণমাধ্যম অবরুদ্ধ থাকলে বিকল্প মিডিয়া ব্যবহার করে বৈশ্বিক চাপ তৈরি করা।
৩. নাগরিক অসহযোগ ও আল্টিমেটাম: কর বর্জন, রাজপথ দখল এবং সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে চূড়ান্ত অভিযাত্রা।
বাস্তবতার কঠিন দেয়াল
তত্ত্বগতভাবে ভারতের একাংশ ও পাকিস্তানের বিরোধীদের এই ফর্মুলা আকর্ষণ করলেও দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় এটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন। ভারতের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন ও বৈচিত্র্যের কারণে কেবল এক বা দুটি রাজ্যের ছাত্র আন্দোলন দিয়ে পুরো দিল্লির ক্ষমতা নাড়ানো অসম্ভব। অন্যদিকে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব এতটাই গভীরে যে, যেকোনো সাধারণ আন্দোলনকে তারা কঠোর হাতে দমন করতে সক্ষম।
তা সত্ত্বেও, উপমহাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের কাছে ‘বাংলাদেশী ফর্মুলা’ এখন একটি আধুনিক দ্রোহের প্রতীক। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ফর্মুলা প্রয়োগের চেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা সময়ই বলবে, তবে এটি যে দুই দেশের শাসকদলকে গভীর উদ্বেগে রেখেছে, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।