এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ আগষ্ট ২০২৬ , ০৮:৫৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা, নিহত ১৬৫; নিখোঁজ প্রায় ১,৫০০

হিমবাহ ধসে নেমে আসে পানি, কাদা ও পাথরের স্রোত; নিশ্চিহ্ন হয়েছে গ্রাম, সড়ক ও অবকাঠামো—উদ্ধারে চলছে ব্যাপক অভিযান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে কমপক্ষে ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় ১ হাজার ৫০০। তাঁদের মধ্যে ৭০০-এর বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বুধবার হিমালয়ের একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে এসে সীমান্তবর্তী উপত্যকা ও জনবসতিতে আঘাত হানে।

নেপালের রসুয়া, নুয়াকোটসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও পাথর ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অনেক জায়গায় এখনো যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, পুলিশ, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নদীর পানির উচ্চতা, ধসে পড়া রাস্তা এবং বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

কীভাবে শুরু হলো ভয়াবহ বিপর্যয়

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, একটি ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, আসলে কোনো ভূমিকম্প এই দুর্যোগের মূল কারণ ছিল না। হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে প্রচণ্ড গতিতে পানি, বরফ, পাথর ও কাদা নিচের দিকে ছুটে আসে।

স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। ধসে পড়া বরফ ও পাথর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে নদী উপত্যকায় আঘাত করে। এর ফলে লহেন্দে নদীতে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ জমা হয় এবং পরে তা প্রবল বন্যার সৃষ্টি করে।

নিখোঁজদের বড় অংশ বিদেশি

এই দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকা। নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ছিলেন। বিশেষ করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রাপথে থাকা বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন।

নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের হিসাবে কয়েক শ বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নাগরিকদেরও নিখোঁজদের তালিকায় পাওয়া গেছে।

চীনের তিব্বত অংশেও কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দুই দেশের মিলিত হিসাবে নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

গ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস

বন্যার স্রোতে একাধিক বসতি ও বাজার এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালে অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, কিছু এলাকায় পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জাতিসংঘও জরুরি সহায়তার জন্য কর্মী ও ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

হাজারো মানুষ এখন নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। উদ্ধারকারী দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তবে আরও ভূমিধস বা নদীতে নতুন করে ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।