প্রকাশিত: ০৪ আগষ্ট ২০২৬ , ০৫:৫৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভা থেকে জুলাই সনদ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। সভায় অংশ নেওয়া শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক ও কমিউনিটি নেতারা বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সম্মান জানাতে হলে অভ্যুত্থানের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তব রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রতিফলিত করতে হবে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফর বাংলাদেশ, (এইচআরডিবি):র উদ্যোগে গত রোববার, ২ আগস্ট সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১৬৬-১৫, ৮৯তম অ্যাভিনিউ, কাফিজ কমিউনিটি হল জ্যামাইকা, নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় অন্যতম বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নকিবুর রহমান।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন এইচআরডিবির পরিচালক জিয়াউল ইসলাম শামীম, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ সম্রাট, লিভারপুল হোপ ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং জুলাই ফাউন্ডেশন ইউকের সদস্য খন্দকার কবির উদ্দীন, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ এ খান এবং লেখিকা ও এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যুক্ত কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট রওশন হক।
ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ এ খান নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও সম্পাদক। খন্দকার কবির উদ্দীনকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পিএইচডি গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির মুসলিমস ইন ব্রিটেন রিসার্চ গ্রুপের সদস্য। সভায় বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের আলোচনার সারকথা ছিল, একটি সরকার বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যেই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে মানুষের ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন, জুলাইয়ের শহীদ, আহত এবং নির্যাতিত মানুষের আত্মত্যাগকে স্মরণ করার পাশাপাশি অভ্যুত্থানের মূল দাবি বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু বার্ষিকী পালন, আলোচনা সভা কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়। জনগণের সামনে দেওয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই জুলাইয়ের অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া সম্ভব।
তাঁরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব হলে জনগণ, বিশেষ করে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি হতে পারে। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের পথ বন্ধ করতে হলে সংস্কার কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নিতে হবে।
বক্তারা সরকারের প্রতি জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, সময়সীমা এবং অগ্রগতি জনগণের সামনে পরিষ্কার করার আহ্বান জানান।
তাঁদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির মতো মৌলিক প্রশ্নে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি।
আলোচনায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকার কথাও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, দেশের বাইরে অবস্থান করলেও প্রবাসীরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্নে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সংগত দাবি তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরি করা প্রবাসী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন বিআইসির ইমাম জুনায়েদ হোসাইন। সভা পরিচালনা করেন নিউইয়র্কের কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট নুরুল আনোয়ার।
সভা থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে আহত, নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যথাযথ স্বীকৃতি, পুনর্বাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
আলোচনা সভার সমাপনী আহ্বানে বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে এর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, মানবাধিকার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসে জনমত গঠনের লক্ষ্য নিয়ে প্রায় দুই দশক আগে উদ্বিগ্ন কয়েকজন নাগরিকের উদ্যোগে এইচআরডিবির যাত্রা শুরু হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোট পরিসরে মৌলিক অধিকারবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শুরু হলেও পরে গবেষণা, সেমিনার, গণমাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা, ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে কথা বলা এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে নীতিগত প্রচারণায় এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।
প্রকাশ্য নথিতে অন্তত ২০১২ সাল থেকে নিউইয়র্কে সংগঠনটির মানবাধিকারবিষয়ক সেমিনারের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ উত্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে সংগঠনটি আলোচনায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫০১(সি)(৩) করমুক্ত অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করে।