প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ১১:৫৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানকে ঘিরে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার হিসেবে পরিচিত এই বিমান যুক্ত হলে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। তবে শুধু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন উন্নত রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, নিরাপদ বিমানঘাঁটি এবং যুদ্ধকালীন সমন্বিত কমান্ড কাঠামো।
বাংলাদেশের জন্য চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম যুদ্ধবিমান এসেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ উপহার হিসেবে পেয়েছিল মিগ-২১ যুদ্ধবিমান। এরপর ১৯৭৭ সালে চীন থেকে আসে এফ-৬, যা চীনে জে-৬ নামে পরিচিত ছিল। রাজধানীর বিজয় সরণি থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে যাওয়ার পথে প্রদর্শিত যুদ্ধবিমানটি এই মডেলেরই একটি।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান সংগ্রহে চীনের ভূমিকা আরও বাড়ে। আশির দশকে এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান যুক্ত হয় বিমানবাহিনীতে। ১৯৯৯ সালে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ কেনার মাধ্যমে বহরে আবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমানগুলোর বড় অংশই পুরোনো হয়ে গেছে।
সামরিক তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ২১২টি। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান ৪৪টি। রয়েছে আটটি মিগ-২৯ এবং চীনের তৈরি ৩৬টি এফ-৭। পাশাপাশি রাশিয়ার ১৪টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ ও হালকা আক্রমণ সক্ষম বিমানও রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশারের মতে, মিগ-২৯ তুলনামূলকভাবে আধুনিক হলেও বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতায় সেটিও পুরোনো হয়ে পড়েছে। এফ-৭সহ বাংলাদেশের অন্য যুদ্ধবিমানগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বর্তমান প্রজন্মের ৪.৫ জি বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
জে-১০সি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ যে জে-১০সি সংগ্রহের দিকে এগোচ্ছে, সেটি মূলত একটি মাল্টিরোল ফাইটার। অর্থাৎ একই যুদ্ধবিমান দিয়ে একাধিক ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
আকাশযুদ্ধে শত্রু বিমান প্রতিহত করার পাশাপাশি এটি স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, স্থলযুদ্ধে সেনাদের বিমান সহায়তা এবং সমুদ্র এলাকায় নৌবাহিনীকে সহায়তা দিতে পারে।
সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় জে-১০সি আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় আসে। পাকিস্তান দাবি করেছিল, এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে তারা ভারতীয় রাফালসহ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ওই দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সংঘাতের পর জে-১০সি-এর সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব মূলত এখানেই। পুরোনো যুদ্ধবিমান বহরের জায়গায় আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার যুক্ত হলে আকাশ প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ সক্ষমতা দুটিই বাড়তে পারে।
যুদ্ধবিমান একা যুদ্ধ জেতায় না
তবে আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা হলো, একটি যুদ্ধবিমান যত উন্নতই হোক, সেটি একা পুরো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে না।
যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘপাল্লার রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা জ্যামিং ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা।
বিশেষ করে ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ বা চোখে না দেখেও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিক আকাশযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুদ্ধবিমান, রাডার, ড্রোন এবং স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে পারলে একটি দেশের সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা অনেক বেশি কার্যকর হয়।
সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ শুধু যুদ্ধবিমান নয়, এর সঙ্গে স্পেয়ার পার্টস, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জামসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিও এর অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশে গ্রাউন্ড-বেজড রাডার নেটওয়ার্কও চালু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে যুদ্ধবিমান ও ড্রোনকে এই নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বাড়বে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিমানঘাঁটি নিয়ে
আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে সেগুলোর নিরাপদ সংরক্ষণ ও পরিচালনা।
যুদ্ধের সময় বিমান আকাশে ওঠার আগেই যদি শত্রুর হামলায় বিমানঘাঁটি বা রানওয়ে অচল হয়ে যায়, তাহলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এর একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা গিয়েছিল। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলায় তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাকিস্তানি বিমানগুলো উড্ডয়ন করতে পারেনি। মাটিতে থাকা এসব যুদ্ধবিমান পরে হামলার সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই আধুনিক বিমানঘাঁটিতে একাধিক রানওয়ে, শক্তিশালী বিমান শেল্টার, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিমান রাখার ব্যবস্থা এবং দ্রুত সতর্কতা জানানোর প্রযুক্তির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বড় দুর্বলতা হলো নিজস্ব সামরিক এয়ারফিল্ডের সীমাবদ্ধতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটির সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচলেরও সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বড় ধরনের সংঘাতের ক্ষেত্রে এগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।
তার মতে, বোমা প্রতিরোধী শক্তিশালী বিমান শেল্টার এবং একাধিক রানওয়েসহ অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বিমানঘাঁটি তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে যুদ্ধবিমান পরিচালনার জন্য ব্যবহারযোগ্য এয়ারফিল্ডের সংখ্যা ১৩টি বলে উল্লেখ করেছেন সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার। তবে সবগুলোকে সবসময় সক্রিয় রাখার সক্ষমতা এখনও সীমিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর ও কক্সবাজার থেকে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে আরও কয়েকটি বিমানঘাঁটি ব্যবহারযোগ্য রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
চীনের ওপর নির্ভরতা কেন বাড়ছে
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে চীন থেকে আসছে। নৌবাহিনীর দুটি সাবমেরিনই চীনের তৈরি। যুদ্ধজাহাজ, কর্ভেট, ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও চীনা সরঞ্জামের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, তুলনামূলক কম দামে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও সম্প্রতি বলেছেন, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমান অনেক কম খরচে সংগ্রহ করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিমানবহরের বড় অংশ রুশ প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে চীনা প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ব্যবহারে কিছু কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। ফলে নতুন অস্ত্র কেনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম রাজনৈতিক শর্ত। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহারবিধি ও নজরদারি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের শর্ত থাকতে পারে। চীনা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সেই ধরনের শর্ত তুলনামূলক কম বলে মনে করেন বাংলাদেশের কিছু সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।
সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে
জে-১০সি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে যুক্ত হলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে পুরোনো যুদ্ধবিমান বহরের আধুনিকায়ন। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক অভিযানে বহুমুখী সক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে এর সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। চীনা প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে সরবরাহব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে।
আরও বড় বিষয় হলো, উন্নত যুদ্ধবিমান কেনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি বিমানঘাঁটি, রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধকালীন কমান্ড কাঠামো উন্নত করা না যায়, তাহলে বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু ‘কতটি জে-১০সি কেনা হচ্ছে’ এমন নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এসব বিমানকে ঘিরে কতটা সমন্বিত ও টেকসই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাচ্ছে।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় যুদ্ধবিমান হলো পুরো ব্যবস্থার একটি অংশ। কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য দরকার যুদ্ধবিমান, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নিরাপদ ঘাঁটি, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা। জে-১০সি সেই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি নতুন স্তর হতে পারে, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়।