প্রকাশিত: ১০ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:৫৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
গাজা উপত্যকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ১৫ দফার ‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace) শান্তি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা দল হামাস সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী এক চুলও পিছু হটবে না বলে সরাসরি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। রোববারে অনুষ্ঠিত নিজস্ব মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা মার্কিন নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নেতানিয়াহুর স্পষ্ট বার্তা এবং মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েন গাজার চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
নেতানিয়াহুর ঘোষণা ও মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের সংঘাত
গত ৩০ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় সংঘাত নিরসন ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৫ দফার এক "ঐতিহাসিক" শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা ‘বোর্ড অব পিস’ নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনায় হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করা এবং পরবর্তীতে একটি অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল। হামাস গত মাসে এই পরিকল্পনার শর্তাবলীতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছিল।
তবে রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে সরাসরি নাকচ করে নেতানিয়াহু বলেন:
"ইসরায়েল এই ১৫ দফার প্রস্তাবিত চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করছে। হামাসকে সত্যিকার অর্থে এবং সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা থেকে কোনো ধরনের সেনা প্রত্যাহার করবে না। আমাদের নাগরিক ও বাহিনীর ওপর যেকোনো হুমকি নস্যাৎ করতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।"
নেতানিয়াহু আরও যোগ করেন যে, "যতদিন আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকব, ততদিন কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতে দেওয়া হবে না।" তিনি দাবি করেন যে, আমেরিকা কিছু প্রস্তাব দিয়েছে যা ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইসরায়েল নিজের নীতিতে অটল থাকতে ভালো করেই জানে।
গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের মূল শর্ত হলো "প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ"—যার অর্থ কেবল ভারী রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং হামাসের কাছে থাকা হালকা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে শুরু করে সামরিক সুরঙ্গ নেটওয়ার্ক ও সমরাস্ত্র কারখানা পর্যন্ত সবকিছুর সম্পূর্ণ বিনাশ। কিন্তু মার্কিন প্রস্তাবিত রোডম্যাপে প্রথমে হামাসের ভারী অস্ত্র ও সুরঙ্গ ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল এবং পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল, যা নেতানিয়াহু মানতে নারাজ।
গাজার বাস্তব চিত্র: ‘যুদ্ধবিরতি’র নামে ধারাবাহিক হামলা
গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি তথাকথিত "যুদ্ধবিরতি" বা সিসফায়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে গাজা উপত্যকায় সংঘাতের তীব্রতা কমেনি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই পুরো গাজায় বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী:
অক্টোবরের তথাকথিত সিসফায়ারের পর ক্ষয়ক্ষতি: যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্ততঃ ১,২৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪,১২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮০০-র বেশি মৃতদেহ।
মোট প্রাণহানি: ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ও আগ্রাসনে এ পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্ততঃ ৭৩,৩০০ জনে এবং আহতের সংখ্যা ১৭৪,০০০ অতিক্রম করেছে।
শিশুদের জন্য ভয়াবহতা: আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় প্রতিদিন গড়ে অন্ততঃ একজন করে শিশু ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে। গাজায় বিষাক্ত পানীয় জল ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে লক্ষাধিক পরিবার মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘রিসেট বাটন’ চাপলেন নেতানিয়াহু: দখলিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষক নূর ওদেহ মন্তব্য করেছেন, "নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা মূলতঃ পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে আবার আগের শূন্য স্থানে বা ‘রিসেট বাটনে’ ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। ট্রাম্পের গঠিত 'বোর্ড অব পিস'-এর পরিচালক নিকোলে ম্লাদেনভ সম্প্রতি নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করলেও, ইসরায়েলি সমর্থন ছাড়া এই বোর্ডের বাস্তবায়ন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।"
ফিলিস্তিনিদের ভবিতব্য নিয়ে প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার গাজা প্রতিনিধি হানি মাহমুদ জানিয়েছেন যে, নেতানিয়াহুর এই পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাখ্যান গাজার সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধ থেকে মুক্তির পথ নিয়ে গভীর প্রশ্ন ও হতাশা তৈরি করেছে। পর্যায়ক্রমিক সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক জটিলতা: ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধ থামিয়ে ঐতিহাসিক জয়ের যে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, নেতানিয়াহুর একক সিদ্ধান্তে তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। যদিও হোয়াইট হাউস বা হামাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে এই প্রত্যাখ্যানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কূটনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সার্বিক বিশ্লেষণ: শান্তি নাকি অনির্দিষ্টকালের দখলদারিত্ব?
নেতানিয়াহুর সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল কেবল হামাসের নিরস্ত্রীকরণেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং গাজায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস' প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নেতানিয়াহু মূলতঃ ওয়াশিংটনকে বার্তা দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইসরায়েল আমেরিকার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ক্রমাগত হামলা ও প্রাণহানি প্রমাণ করে যে গাজায় মানবিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো বাস্তবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। নেতানিয়াহুর এই একগুয়ে মনোভাব গাজায় দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতকে উস্কে দেওয়ার পাশাপাশি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।