প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রে চীনে তৈরি উন্নতমানের হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নেওয়া এ পদক্ষেপকে মূলত চীনের দ্রুত অগ্রসরমান রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতকে লক্ষ্য করেই নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গতকাল এ ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। একই সঙ্গে ডাটা সেন্টার ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিদেশে তৈরি পাওয়ার ইনভার্টার আমদানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি)।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা উন্নত প্রযুক্তির রোবটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে মানবসদৃশ হিউম্যানয়েড রোবট এবং চার পায়ের রোবট। বর্তমানে এসব প্রযুক্তির উৎপাদন ও উন্নয়নে চীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি এবং এআই ও রোবোটিকস খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
এফসিসি চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোকে তাদের 'কাভার্ড লিস্ট'-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ তালিকায় এমন প্রযুক্তিপণ্য রাখা হয়, যেগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র নতুন বিদেশে তৈরি উন্নত রোবট ও পাওয়ার ইনভার্টারের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। আগে থেকেই এফসিসির অনুমোদন পাওয়া বিদ্যমান মডেলগুলোর আমদানি বা বিক্রির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
এফসিসির আশঙ্কা, বিদেশে তৈরি পাওয়ার ইনভার্টারের মাধ্যমে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দূর থেকে সিস্টেম বন্ধ করে দিতে, তথ্য চুরি করতে, অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে কিংবা সাইবার হামলা চালানোর সুযোগ পেতে পারে। একই ধরনের ঝুঁকি রোবটের ক্ষেত্রেও রয়েছে বলে সংস্থাটি দাবি করেছে।
তাদের মতে, উন্নতমানের বিদেশি রোবট ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা দূর থেকে রোবটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। দূতাবাসের ভাষ্য, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ইস্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং ভিত্তিহীন নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে আসছে।
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটির স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে সব দেশকে জনকল্যাণমূলক ও ইতিবাচক উদ্দেশ্যে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
চীনা দূতাবাস আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত 'আধিপত্যবাদী মানসিকতা' পরিত্যাগ করে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি বন্ধ করা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রশ্নে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে চীনা রফতানি পণ্যের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
উচ্চ শুল্কের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ি রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীন কার্যত মার্কিন ইভি বাজার থেকে বাইরে রয়েছে। পাশাপাশি চীনের সামরিক আধুনিকায়নের গতি কমানো এবং এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগণ্য অবস্থান ধরে রাখতে উন্নতমানের মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর চীনের কাছে বিক্রিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে চীনের এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
অন্যদিকে চীন দাবি করেছে, তাদের এআই খাতের সাফল্য এসেছে নিজস্ব গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে।
উল্লেখ্য, গত বছর চীন ইলেকট্রনিকস শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রফতানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
বর্তমানে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য দ্রুতগতিতে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব রোবট বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার ক্ষেত্রেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তারা মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগেই ব্যাপক বাজার দখলের চেষ্টা করছে।