এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬ , ০১:৫২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ইরানের হরমুজকে পাশ কাটাতে ইরাক-সিরিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ

হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব কমাতে ইরাক ও সিরিয়াকে নিয়ে পুরোনো একটি তেল পাইপলাইন পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ এই পাইপলাইন আবার চালু করার বিষয়ে তিন দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই) ইরাকি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির বৈঠকের সময় এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। ট্রাম্পের তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া-ইরাক বিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক ইতোমধ্যে চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হলে ইরাকের তেল সরাসরি সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরে পৌঁছাবে। ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিকল্প পথ তৈরি হবে।

১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা নিয়ে পাইপলাইনটি নির্মাণ করে। তবে আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া ইরানের পক্ষ নেওয়ায় বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযান চলাকালে এটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পাইপলাইনটি সচল করতে নতুন স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণসহ বড় ধরনের পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। এ কাজে মার্কিন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা তখন এগোয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর অবস্থানের পর প্রকল্পটি আবারও অগ্রাধিকার পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরাককে বুঝিয়েছে যে, তেল রপ্তানির জন্য বিকল্প করিডর তৈরি করা এখন কৌশলগত প্রয়োজন। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট-এর বিশ্লেষক সারহাং হামাসায়িদের ভাষায়, যুদ্ধের বাস্তবতা ইরাককে সিরিয়ার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছে।

সূত্র জানায়, পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর আরোপিত বেশ কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে এবং দেশটিকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য প্রকল্পে অংশ নেওয়া সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চলতি মাসের শুরুতে ইরাক সরকার কিরকুক ও আনবার প্রদেশের হাদিথা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং একটি কাতারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোর একটি ইরাক। দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল রপ্তানি এই জলপথ দিয়েই হয়। অথচ রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল বিক্রির আয় থেকে। জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি নেমে আসে আগের বছরের গড় রপ্তানির মাত্র ৮ শতাংশে। ফলে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির এই উদ্যোগকে ইরাকের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।