প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০৮:১৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় আবিষ্কারের সূচনা হয়েছে ছোট্ট কোনো সূত্র থেকে। কখনও ধুলোমাখা একটি নথি, কখনও পুরোনো মানচিত্র, আবার কখনও একটি ভুলে যাওয়া জীবাশ্ম। অ্যান্টার্কটিকার ইতিহাসেও তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের সূচনা হলো একটি মাত্র হাড়ের টুকরো দিয়ে। প্রায় ৪০ বছর ধরে গবেষণাগারের একটি ড্রয়ারে নীরবে পড়ে থাকা সেই জীবাশ্ম এখন স্বীকৃতি পেয়েছে অ্যান্টার্কটিকায় আবিষ্কৃত প্রথম ডাইনোসরের জীবাশ্ম হিসেবে। ছোট্ট এই আবিষ্কার শুধু একটি ডাইনোসরের অস্তিত্বই নিশ্চিত করেনি, বরং কোটি কোটি বছর আগের অ্যান্টার্কটিকার এক সবুজ, প্রাণময় পৃথিবীর দরজাও নতুন করে খুলে দিয়েছে।
ঘটনার শুরু ১৯৮৫ সালে। অ্যান্টার্কটিকার জেমস রস দ্বীপে গবেষণা অভিযানের সময় ভূতাত্ত্বিক ড. মাইক থমসনের দল একটি অদ্ভুত জীবাশ্ম সংগ্রহ করে। মাঠপর্যায়ের নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, এটি সম্ভবত একটি "বড় সরীসৃপের কশেরুকা"। কিন্তু সেই সময় প্রযুক্তি ও তথ্যের সীমাবদ্ধতায় গবেষকেরা নিশ্চিত হতে পারেননি, এটি আসলে কোন প্রাণীর হাড়। ধারণা করা হয়েছিল, এটি হয়তো কোনো প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক সরীসৃপের অংশ। ফলে নমুনাটি যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে অন্য হাজারো নমুনার ভিড়ে হারিয়ে যায়।
চার দশক পর পুরোনো সংগ্রহ পুনর্বিন্যাসের সময় ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সংগ্রহ ব্যবস্থাপক ড. মার্ক ইভান্সের চোখে পড়ে জীবাশ্মটি। এর গঠন তাঁর কাছে অন্য রকম মনে হয়। সন্দেহ থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক পল ব্যারেটের সহায়তা নেন।
বিশদ বিশ্লেষণের পর গবেষকেরা নিশ্চিত হন, এটি টাইটানোসর নামের বিশাল আকৃতির এক তৃণভোজী ডাইনোসরের লেজের কশেরুকা। হাড়টির এক প্রান্তে গর্ত এবং অন্য প্রান্তে বলের মতো গোলাকার সংযোগস্থল রয়েছে, যা টাইটানোসরদের কশেরুকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই গঠনই গবেষকদের নিশ্চিত করে, এটি কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর নয়, বরং স্থলচর ডাইনোসরের জীবাশ্ম।
টাইটানোসর পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণীদের অন্যতম। দীর্ঘ গলা, শক্তিশালী দেহ আর ভারসাম্য রক্ষাকারী লম্বা লেজ ছিল তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সবচেয়ে বড় টাইটানোসরগুলোর দৈর্ঘ্য ৩৫ মিটার পর্যন্ত এবং ওজন প্রায় ৬০ টন হতে পারত। তবে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া এই জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণীটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৭ মিটার। এটি হয়তো একটি অল্পবয়সী ডাইনোসর ছিল, অথবা এমন কোনো প্রজাতির সদস্য, যাদের আকার স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক ছোট ছিল।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য লুকিয়ে আছে অ্যান্টার্কটিকার অতীতে। আজ যে মহাদেশ বছরের পর বছর বরফে ঢাকা থাকে, কোটি বছর আগে তার চেহারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বছর আগে শেষ ক্রিটেশিয়াস যুগে সেখানে ছিল বিস্তীর্ণ বনভূমি, নদী, জলাভূমি এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ। সেই সবুজ পরিবেশে বিচরণ করত বিশাল তৃণভোজী ডাইনোসর, তাদের শিকারি মাংসাশী প্রাণী এবং আরও বহু অজানা জীব।
বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকায় জীবাশ্ম অনুসন্ধান বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন বৈজ্ঞানিক কাজগুলোর একটি। বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা এই মহাদেশে গবেষণার সুযোগ সীমিত। ফলে সেখানে পাওয়া প্রতিটি জীবাশ্মই পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল। ১৯৮৫ সালের পর অ্যান্টার্কটিকায় আরও কিছু ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলেছে, কিন্তু সংখ্যা এখনো খুবই কম।
একটি ছোট্ট হাড়ের টুকরো কখনও কখনও একটি মহাদেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। চার দশক ধরে নীরব থাকা এই জীবাশ্ম সেই সত্যকেই আবারও মনে করিয়ে দিল। এটি শুধু একটি ডাইনোসরের পরিচয় দেয়নি; বরং দেখিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল ও নির্জন মহাদেশও একসময় ছিল সবুজ, উষ্ণ এবং প্রাণে ভরপুর এক বিস্ময়কর জগৎ। হয়তো বরফের নিচে এখনো লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য গল্প, যা ভবিষ্যতের কোনো গবেষকের হাতে একদিন আবারও আলোয় উঠে আসবে।