প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬ , ১২:৩০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণার সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অংশীদারদের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে সরকার পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে আরও সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে হাঁটছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের কথা থাকলেও এখন সেটি আর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির আলোচনা এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় গেজেট প্রকাশ আগামী অক্টোবরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য আর্থিক চাপ বিবেচনায় অন্তত দুই বছর তা স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। যদিও সরকার এ প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী নয়। সরকারের অবস্থান হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে, তবে এর সময় ও কাঠামো নিয়ে আরও আর্থিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটিকে আরও কয়েকটি বৈঠক করতে হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে অর্থ বিভাগ গেজেট প্রকাশ করবে। সরকারের বিবেচনায় পে কমিশনের সুপারিশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বৈঠকে নতুন পে স্কেলের কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি, গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও আলোচনায় উঠে আসে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বিশেষ বেতন বৃদ্ধি দেওয়া হলেও নতুন কোনো জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। দীর্ঘ এক দশক ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ভাতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তবে সচিব কমিটি ইতোমধ্যে কিছু সংশোধনীসহ একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে তা চলতি বছরের জুলাই মাস থেকেই প্রযোজ্য হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীরা সেই সময় থেকে বকেয়া সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যে সরকার এখন আরও সতর্ক ও ধীরগতির একটি নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে।