এখন সময় ডেস্ক :

প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২৫ , ০৯:৫১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন : বাংলাদেশ পুনর্গঠনের মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে ইসলামী মৌলবাদ

বাংলাদেশের স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে একটি শহরে ইসলামী মৌলবাদীরা ঘোষণা করেছে যে নারীরা আর ফুটবল খেলতে পারবে না। অন্য একটিতে, তারা পুলিশকে এমন একজন ব্যক্তিকে মুক্ত করতে বাধ্য করেছে এবং ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছে, যে জনসমক্ষে তার চুল না ঢেকে রাখার জন্য একজন মহিলাকে হয়রানি করেছে।

এরপর, রাজধানী ঢাকায় এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, সরকার ইসলামকে অসম্মানকারী কাউকে মৃত্যুদন্ড না দিলে তারা নিজ হাতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবে। কয়েকদিন পর, একটি নিষিদ্ধ গোষ্ঠী বাংলাদেশে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি বড় মিছিল করেছে।

বাংলাদেশ যখন তার গণতন্ত্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং তার সাড়ে ১৭ কোটি জনগণের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যত তৈরির চেষ্টা করছে, তখন দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ মুখোশের নীচে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা ইসলামি চরমপন্থীদের একটি ধারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। উগ্রপন্থী নেতারা জোর দিচ্ছেন যে, বাংলাদেশ একটি ইসলামী সরকার গঠন করবে যা ইসলামকে অসম্মানকারীদের শাস্তি দেবে এবং শরীয়তের শালীনতা বলবৎ করে।

রাজনৈতিক কর্মকর্তারা, যারা একটি নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি করছেন, তারা স্বীকার করেছেন যে সম্ভবত, বাংলাদেশের একটি সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে, এটিকে বহুত্ববাদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে এবং আরও ধর্মীয় ধারায় সংবিধান পুনর্নির্মাণ করা হবে।

দেশে মৌলবাদীদের দৌরাত্ম বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করেছিল। এখন তারা নিজেদেরকে এমন একটি ধর্মীয় জনতাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে দেখছে, যা নারী ও হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এবং ইসলামের ছোট সম্প্রদায়ের অনুসারীদের প্রতি নিপিড়নমূলক।

সমালোচকরা বলছেন, ৮৪ বছর বয়সী নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোরভাবে পিছু হটেনি। তারা ইউনূসকে নরম, গণতান্ত্রিক সংস্কারের আগাছায় হারিয়ে যাওয়া, দ্ব›দ্ব-বিরোধী এবং চরমপন্থীরা আরও জনসাধারণের জায়গা দখল করার কারণে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে অক্ষম বলে অভিযোগ করেন।

হাসিনার পতনের পর পুলিশ বাহিনীর একাংশ কর্মস্থল ত্যাগ করেছে, তারা আর আইন-শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারছে না। সামরিক বাহিনী, যারা কিছু নজরদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাদের সাথে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের সাথে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ হচ্ছে, যারা অতীতের নৃশংসতার জন্য সেনা কর্মকর্তাাদের জবাবদিহিতা চায়।

বাংলাদেশে যা ঘটছে তা মৌলবাদের একটি ঢেউয়ের প্রতিফলন, যা এই অঞ্চলকে গ্রাস করেছে। আফগানিস্তান একটি চরম জাতিগত-ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যা নারীদের মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করছে। পাকিস্তানে ইসলামপন্থী চরমপন্থীরা বছরের পর বছর ধরে সহিংসতার মাধ্যমে তাদের একই ইচ্ছা প্রকাশ করছে। ভারতে, একটি হিন্দু ডানপন্থী শাসক দল দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ঐতিহ্যকে ক্ষুন্ন করেছে। মিয়ানমারে বৌদ্ধ উগ্রপন্থীরা জাতিগত নির্মূল অভিযানের তদারকি করছে।বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক মন্ত্রী ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম, যিনি সম্প্রতি একটি নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার আগে পদত্যাগ করেছিলেন, স্বীকার করেছেন যে দেশটি চরমপন্থার দিকে ধাবিত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীরা এতটাই সমন্বিত যে তারা, ৩৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিতে রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ হারগুলির মধ্যে একটি। তাদের জোর করে ঘরে ফিরিয়ে আনার যে কোনো প্রচেষ্টা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। চরমপন্থী শক্তিগুলি তাদেও সেই পথে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এখন, ক্ষুদ্র চরমপন্থী দলগুলো যেগুলো সম্পূর্ণভাবে বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে উড়িয়ে দিতে চায়, এবং আরো মূলধারার ইসলামী দলগুলো, যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে চায়, তারা আরও রক্ষণশীল বাংলাদেশের একটি যৌথ লক্ষ্যে একত্রিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক শূন্যতায় স্থানীয় পর্যায়ে পুরুষরা ইসলামী শাসনের নিজস্ব ব্যাখ্যা নিয়ে আসছেন।

দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেছেন, দলটি একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র চায়। ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্রণে এর সবচেয়ে কাছের মডেল হল তুরস্ক। পরওয়ার বলেন, ‘ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আচরণ ও নৈতিকতার দিক দিয়ে নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এই নির্দেশিকাগুলির মধ্যে মহিলারা যে কোনও পেশা, খেলাধুলা, গান, থিয়েটার, বিচার বিভাগ, সামরিক এবং আমলাতন্ত্রে অংশ নিতে পারেন।'