ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২১ আগষ্ট ২০২৬ , ০৯:২১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল, উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ

প্রয়োজনের তুলনায় ৬০–৮০ শতাংশ কম গ্যাস; শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে লোকসানের আশঙ্কা

গ্যাস সরবরাহের সংকটে বড় ধরনের উৎপাদন ব্যাঘাতের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নরসিংদী। প্রয়োজনের তুলনায় কোনো কোনো কারখানায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গত দুই সপ্তাহে নরসিংদীর কিছু শিল্পকারখানায় উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নরসিংদী দেশের অন্যতম বড় শিল্পকেন্দ্র। বিশেষ করে বস্ত্র, সুতা, ডাইং, নিটিং ও বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনমুখী কারখানা এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার বড় একটি অংশ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ কমে গেলে শুধু কারখানার উৎপাদন কমে না, পুরো সরবরাহব্যবস্থাতেই এর প্রভাব পড়ে।

কারখানা মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কম সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও আবার চাপ এত কম যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। যেসব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন প্রয়োজন, সেখানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব শুধু মালিকদের ওপর পড়ে না। শ্রমিকদের কাজের সময় কমে যেতে পারে, নতুন নিয়োগ স্থগিত হতে পারে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলের একটি বড় অংশ দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এখানকার সুতা, কাপড় ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কারখানায় যায়। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত।

গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমলে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিল্পকারখানার জন্য এটি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকটের সঙ্গে যদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপও যুক্ত হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে প্রথম ধাক্কা আসে উৎপাদনে। এরপর বাড়ে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয়। উৎপাদন কমে গেলে কারখানার আয় কমে, কিন্তু অনেক স্থায়ী ব্যয় একই থাকে। দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চললে কারখানাগুলোর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদন সচল থাকলেই বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও রাজস্ব—সবগুলো খাত ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেই গ্যাস সংকটের অভিযোগ রয়েছে। নরসিংদীর বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি জেলার শিল্পসমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহের বড় চ্যালেঞ্জের একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে না পারলে শিল্প উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।