প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬ , ০২:০২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন পরিবর্তনের শব্দ খুব বেশি শোনা যায় না। রাজপথ শান্ত থাকে, শিরোনাম উত্তপ্ত থাকে না, বক্তৃতায় বিপ্লবের উচ্চারণও কমে আসে। অথচ রাষ্ট্রের গভীরে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, রাজনৈতিক আচরণের ভাষায় এবং ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতিতে শুরু হয় এক নীরব রূপান্তর। ইতিহাসের বিচারে এই নীরব রূপান্তরই অধিক স্থায়ী। কারণ বিপ্লব রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের সুযোগ দেয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান সেই পরিবর্তনকে স্থায়িত্ব দেয়।
বাংলাদেশ আজ ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে যদি কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ক্ষুণ্ন হবে। জুলাই মূলত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের আহ্বান। জনগণের সার্বভৌমত্ব, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাই ছিল সেই আহ্বানের কেন্দ্রবিন্দু। সেই আহ্বানের প্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগার সংসদ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, বিপ্লবের সফলতা রাজপথে নয়, সংসদে যাচাই হয়। কারণ রাজপথ ক্ষমতা বদলাতে পারে, কিন্তু সংসদ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়। জনগণের আবেগ নির্বাচন সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে সংসদীয় প্রতিষ্ঠান। সেই কারণেই বিশ্বের পরিণত গণতন্ত্রগুলোতে বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত ছিল। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সংসদ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে পরিচালিত হয়েছে, আবার অন্য সময়ে বিরোধী দল সংসদ বর্জনকে প্রধান রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলাফল হয়েছে একই। সংসদ দুর্বল হয়েছে, নির্বাহী বিভাগ শক্তিশালী হয়েছে, আর জনগণের প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে তার প্রাণশক্তি হারিয়েছে।
এই দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর অভিজ্ঞতার পর বর্তমান সংসদের কার্যক্রম একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে সরকার তার আইনগত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছে, আবার বিরোধী দল সংসদ ত্যাগের পরিবর্তে সংসদের ভেতর থেকেই প্রশ্ন, সংশোধনী, বিতর্ক এবং বিকল্প মত উপস্থাপনের পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু রাজনৈতিক আচরণের দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
একটি সুস্থ সংসদে সরকারের শক্তি তার সংখ্যায় নয়, যুক্তিতে পরিমাপ হয়। বিরোধী দলের শক্তিও তার স্লোগানে নয়, তথ্যের গভীরতায়। সংসদে উচ্চকণ্ঠের চেয়ে শক্তিশালী হলো সুপ্রস্তুত যুক্তি। কারণ একটি তথ্যনির্ভর প্রশ্ন অনেক সময় শত বক্তৃতার চেয়েও কার্যকরভাবে সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে সেই সংস্কৃতির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দল প্রতিটি বিষয়ে একমুখী প্রত্যাখ্যানের পথ গ্রহণ না করে বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা, সংশোধনের দাবি এবং বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করছে। সরকারও অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের সুযোগ দিচ্ছে। সংসদের স্থায়ী কমিটি, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে অধিক সক্রিয় হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত গুরুত্ব অন্যত্র। জুলাইয়ের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক শক্তি যেন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে না পারে। সংসদ সেই সীমাবদ্ধতার সাংবিধানিক রূপ। একটি কার্যকর সংসদ সরকারের ক্ষমতা কমায় না, বরং ক্ষমতার বৈধতা বৃদ্ধি করে। কারণ যে সরকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সমালোচনা সহ্য করতে পারে এবং সংশোধন গ্রহণ করতে পারে, সেই সরকারই প্রকৃত অর্থে আত্মবিশ্বাসী।
আজকের বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য নয়। এটি হবে রাষ্ট্রচিন্তার বিজয়। কারণ শক্তিশালী সরকার এবং শক্তিশালী বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং গণতন্ত্রের দুই অপরিহার্য স্তম্ভ।
এখনও পথ দীর্ঘ। সামনের অধিবেশনগুলোই নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তন সাময়িক নাকি স্থায়ী। সামনে থাকবে বাজেট, আইন সংস্কার, সাংবিধানিক প্রশ্ন, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে কঠিন বিতর্ক। সেখানেই বোঝা যাবে সংসদ কেবল বক্তব্যের মঞ্চ হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে জাতির বিবেকে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ আর কেবল একটি নতুন সরকার চায় না। এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়। সেই সংস্কৃতিতে বিরোধী দল শত্রু নয়, সমালোচনামূলক সহযোগী। সরকার প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার শক্তি নয়, যুক্তির মাধ্যমে আস্থা অর্জনের নেতৃত্ব। স্পিকার কেবল অধিবেশন পরিচালনাকারী নন, বরং সংসদীয় মর্যাদার অভিভাবক। আর সংসদ সদস্য কেবল দলের প্রতিনিধি নন, জনগণের অর্পিত আমানতের ধারক।
যদি এই দর্শন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো লিখবে, জুলাইয়ের প্রকৃত বিজয় কোনো নির্বাচনের ফলাফলে নয়, বাংলাদেশের সংসদে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।
আমি মনে করি, এই বিষয়টি একটি নিবন্ধে শেষ হবে না। চেষ্টা থাকবে সচেতন পাঠকের সামনে আরও ব্যাপক তথ্য বিশ্লেষণ ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করার।