ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ , ০৯:১১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জুলাই শহীদ দিবসে স্মরণে আবু সাঈদ

বাংলাদেশে আজ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে ‘জুলাই শহীদ দিবস’। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদের স্মরণে দিনটিকে সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আবু সাঈদের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা ছিল না, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়।

দুই বছর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্যে দেখা যায়, তিনি নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। মুহূর্তের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে এবং আন্দোলনের ভাষা ও প্রতীকে নতুন মাত্রা যোগ করে।

আবু সাঈদের মৃত্যুর দিনই চট্টগ্রামে নিহত হন কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ আরও কয়েকজন। এরপর আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবির গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর জনআন্দোলনে পরিণত হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয় এবং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।

দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ভোরে রাজধানীর রায়েরবাজারে জুলাই শহীদ গণকবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের মাধ্যমে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দেশের সব জেলা শহরের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিশেষ মোনাজাত, প্রার্থনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। একইভাবে চট্টগ্রামে শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের শাহাদাতস্থলে একটি স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ১৬ জুলাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। তিনি উল্লেখ করেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী শক্তির প্রয়োগের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা জাতির বিবেককে জাগ্রত করেছিল। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যকে তিনি ভয়কে জয় করার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা হয়ে থাকবে।

দুই বছর পর আজকের এই রাষ্ট্রীয় আয়োজন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করছে। আবু সাঈদের নাম এখন শুধু একজন শিক্ষার্থীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক প্রতীকী মুখ হয়ে উঠেছেন।