প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬ , ১১:৪৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে, যা দীর্ঘদিনের প্রথা ও আইনি ব্যাখ্যাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর Lisa Cook-কে অপসারণের প্রচেষ্টা এমন এক সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্ষমতা আইনের নির্ধারিত সীমারেখায় আটকে গেছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৫–৪ ভোটের রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টাকে কার্যকর হতে দেয়নি। ফলে লিসা কুক আপাতত তাঁর দায়িত্বে বহাল থাকছেন। তবে আদালত চূড়ান্তভাবে মামলার নিষ্পত্তি করেনি। বরং বলেছে, আইনি প্রক্রিয়া চলবে এবং নিম্ন আদালতে বিষয়টির বিচার অব্যাহত থাকবে। (Reuters)
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ট্রাম্প তাঁকে সরাতে পারলেন না?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ফেডারেল রিজার্ভের কাঠামোর মধ্যে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে ফেডকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক চাপ সুদের হার, মুদ্রানীতি বা আর্থিক স্থিতিশীলতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে। সেই কারণেই ফেডের গভর্নরদের দীর্ঘমেয়াদি নির্দিষ্ট মেয়াদ দেওয়া হয় এবং আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট চাইলে ইচ্ছামতো তাঁদের অপসারণ করতে পারেন না। অপসারণের জন্য “for cause”, অর্থাৎ আইনসম্মত ও যথেষ্ট কারণ থাকতে হয়। (American Bar Association)
ট্রাম্প প্রশাসন লিসা কুকের বিরুদ্ধে মর্টগেজ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগকে অপসারণের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু কুক অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং আদালতে বলেন, তাঁকে যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়নি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়নি। নিম্ন আদালত এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মনে করেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায় না।
এই রায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। আদালত কার্যত বলেছে, ফেডারেল রিজার্ভ সাধারণ কোনো প্রশাসনিক সংস্থা নয়। এর স্বাধীনতা মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুদের হার নির্ধারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক বাজারে আস্থা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেলে পুরো অর্থনীতিই অস্থির হয়ে পড়তে পারে।
তবে এই রায়ের মধ্যেও একটি সতর্ক সংকেত রয়েছে। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্ট অন্য কয়েকটি স্বাধীন সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে। অর্থাৎ আদালত একদিকে ফেডের স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে অন্যান্য স্বাধীন সংস্থার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব বাড়িয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ফেডের এই বিশেষ সাংবিধানিক অবস্থান আবারও আইনি বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে এই মামলার গুরুত্ব কেবল একজন কর্মকর্তার চাকরি রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রানীতি কি নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হবে, নাকি তা পেশাগত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে। যদি প্রতিটি প্রশাসন নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের বসাতে ফেডের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে বাজারের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এ কারণেই লিসা কুকের মামলাকে অনেক বিশ্লেষক ফেডের স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। আদালত ট্রাম্পকে স্থায়ীভাবে পরাজিত ঘোষণা করেনি, কিন্তু স্পষ্ট করে দিয়েছে যে রাজনৈতিক ইচ্ছা মাত্রই যথেষ্ট নয়। আইনের শর্ত, প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে।
সবশেষে বলা যায়, এই রায় ট্রাম্প বনাম লিসা কুকের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের চেয়ে অনেক বড় একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতারও একটি সাংবিধানিক সীমা আছে। আর সেই সীমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রহরীদের একটি হলো স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই আপাতত ট্রাম্প লিসা কুককে সরাতে পারেননি। কারণ, মার্কিন ব্যবস্থায় ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাই শেষ পর্যন্ত অধিক শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হয়েছে।