এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০৬:৪৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ইরানকে অস্থিতিশীল করতে কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিচ্ছে সিআইএ: ট্রাম্প প্রশাসনের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ফাঁস

ইরানের ভেতরে একটি গণঅভ্যুত্থান ত্বরান্বিত করতে এবং বর্তমান সরকারকে উৎখাত করতে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে গোপনে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কুর্দি নেতাদের বরাতে জানা গেছে, ইরানের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সামরিক বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

তেহরান বিরোধী ছক: নেপথ্যে সিআইএ ও ইসরায়েল

সূত্রের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই সিআইএ ইরানের কুর্দি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। বর্তমানে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইরানিয়ান কুর্দিস্তান’ (KDPI)-এর প্রধান মুস্তফা হিজরির সাথে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কুর্দি যোদ্ধারা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিম ইরান সীমান্ত দিয়ে একটি বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করতে পারে। ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরাক-ইরান সীমান্ত সংলগ্ন ইরানি সামরিক আউটপোস্টগুলোতে বিমান হামলা চালিয়ে কুর্দিদের প্রবেশের পথ সুগম করছে বলে দাবি করেছে একাধিক সূত্র।

কৌশলী যুদ্ধনীতি: ‘বাফার জোন’ তৈরির লক্ষ্য

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনার দুটি প্রধান দিক রয়েছে:

১. অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ: কুর্দিরা যখন সীমান্তে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখবে, তখন রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামার সুযোগ করে দেওয়া হবে। যাতে জানুয়ারির বিক্ষোভের মতো এবার আর ইরানি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হতে না পারে।

২. বাফার জোন: উত্তর ইরানে কুর্দিদের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল দখল করে সেখানে ইসরায়েলের জন্য একটি ‘সেফ জোন’ বা ‘বাফার জোন’ তৈরি করা।

ইরাকের অস্বস্তি ও সতর্ক অবস্থান

এই গোপন পরিকল্পনায় সবথেকে বেশি চাপে পড়েছে ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার (KRG)। তাদের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়ার শক্তি আমাদের নেই। আমরা চরম আতঙ্কে আছি।” এদিকে ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরাকের মাটি ব্যবহার করে ইরানে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তারা বরদাশত করবেন না।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি চরম ঝুঁকি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কুর্দিদের ব্যবহার করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ওবামা আমলের পেন্টাগন কর্মকর্তা অ্যালেক্স প্লিটাস মনে করেন, ইরানিরা নিরস্ত্র হওয়ায় সরকার পতনের সম্ভাবনা কম ছিল, তাই কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে আমেরিকা একটি ‘জাম্প-স্টার্ট’ দিতে চাইছে। তবে এর ফল উল্টো হতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

১. কুর্দিদের অবিশ্বাস ও অতীতের তিক্ততা:

মার্কিন প্রশাসন কুর্দিদের বারবার ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলেছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় কুর্দিদের যেভাবে একা ফেলে আসা হয়েছিল, তা ইরানি কুর্দিদের মনে এখনো তাজা। ট্রাম্পের নীতির অস্থিরতা (এক দিন সরকার উৎখাত, অন্য দিন সমঝোতা) কুর্দিদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

২. আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও বিশৃঙ্খলা:

বাইডেন আমলের সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা জেন গ্যাভিটো সতর্ক করেছেন যে, এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করবে এবং এমন এক সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করবে যাদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডে ঠেলে দিতে পারে।

৩. ইরানি সামরিক শক্তির সক্ষমতা:

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) ইতিমধ্যে কুর্দি ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা শুরু করেছে। সিআইএ-র নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী, কুর্দিদের একক শক্তিতে ইরানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রকে উপড়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব।

ওয়াশিংটনের এই পরিকল্পনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। তবে যদি কুর্দিরা মাঝপথে আবারও মার্কিন সমর্থন হারায়, তবে তাদের ওপর নেমে আসবে ভয়াবহ বিপর্যয়, আর ইরান হয়ে উঠবে আরও বেশি আগ্রাসী। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আগামী কয়েক দিনের ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’-এর দিকে।