র‌্যাব কি তুলে দেয়া উচিত হবে?

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের বিলুপ্তি দাবি করেছেন। শুনে দুঃখেও হাসি পেয়েছে। র‌্যাবের জন্ম খালেদা জিয়ার গত সরকারের আমলেই। বিএনপি সরকারই র‌্যাবকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল, যে অভিযোগ এখনও চলছে। তখন অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকেই ক্রসফায়ারে হত্যা বলে আমাদের বিগ মিডিয়াগুলোই প্রচার চালিয়ে আসল তথ্য প্রকাশ করতে সাহস দেখায়নি। এখন আওয়ামী শাসনামলে তারাই সন্ত্রাস দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ সরকারের কাঁধে সব দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর বিএনপি আর কোনো ইস্যু না পেয়ে র‌্যাবের বিলুপ্তির দাবিকেই ইস্যু করে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। যে দলটি ছিল র‌্যাবের প্রসূতি, তাদের মুখেই এখন র‌্যাবের বিলুপ্তির দাবি।
র‌্যাব যখন গঠন করা হয়েছিল, তখন দেশ সন্ত্রাসে ছেয়ে গেছে। বাংলা ভাইদের জঙ্গি অভ্যুত্থান উত্তরবঙ্গে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল। রাজনৈতিক ও অন্যান্য হত্যাকাণ্ড চলছিল অবাধে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দাতা দেশগুলো বিএনপি সরকারের ওপর অনবরত চাপ দিচ্ছিল সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমনের জন্য। বিএনপি সরকারের এক জামায়াতি মন্ত্রী তখন বাংলাভাইদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, এটা মিডিয়ার আবিষ্কার। পরে বিদেশীদের চাপেই বিএনপি সরকার বাংলাভাইদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হয় এবং দ্রুত বিচারে তাদের ফাঁসি দেয়া হয়।

বিএনপি সরকারের আমলে দুই সন্ত্রাসীর ফাঁসি হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকা তখন মৃত্যুদণ্ডদান অন্যায় ও মানবতাবিরোধী বলে চেঁচামেচি করেনি; বরং প্রকারান্তরে এ মৃত্যুদণ্ডদানকে সমর্থন জানিয়েছিল। আর আজ যখন বাংলা ভাইদের চেয়েও ভয়ানক সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপূর্বক মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হচ্ছে, তখন গেল গেল মানবতা গেল বলে পশ্চিমা বিশ্বে শোরগোলের অন্ত নেই। পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী দমনের অজুহাতে ড্রোন হামলা চালিয়ে শয়ে শয়ে নিরীহ নর-নারী-শিশু হত্যায় মানবতা লংঘিত হয় না, লংঘিত হয় বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীকে বিচারপূর্বক প্রাণ দণ্ডাদেশ দেয়া হলে! পশ্চিমা দেশগুলোর ভণ্ডামি এখন মুখোশহীন।

গত বিএনপি সরকারের আমলেই বাংলাদেশে সন্ত্রাস যখন তুঙ্গে, তখন র‌্যাব গঠিত হয়। এখন বেগম জিয়া ভোল পাল্টে যা-ই বলুন, তখন র‌্যাবের প্রশংসায় তার কোনো কোনো মন্ত্রী- বিশেষ করে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যেসব কথা বলেছিলেন, তা কি দেশের মানুষ এত শিগগির ভুলে গেছে? একশ্রেণীর বিগ মিডিয়া সেদিন যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ক্রসফায়ারিংয়ে মৃত্যু বলে চালিয়েছে এবং সত্য প্রকাশে সাহসী হয়নি, তারা আজ সুযোগ বুঝে হঠাৎ সাহসী সাংবাদিকতা শুরু করল কেন, সেটাও এক প্রশ্ন।

সেই গোড়ার দিকে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও দেশের মানুষ তাতে খুব একটা ক্ষুব্ধ হয়নি। বরং র‌্যাবের আবির্ভাবে দেশময় সন্ত্রাসীদের দাপট কিছুটা কমে যাওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ বেড়েছিল। দেশের অনেক বিজ্ঞজন আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সম্পর্কে বলেছেন, ভয়ানক দাগি অপরাধী ও খুনিরা যে দেশে ধরা পড়লেও কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবে ও হস্তক্ষেপে মুক্তি পেয়ে যায় এবং আবার নতুন করে সন্ত্রাসে নামে, সে দেশে বিচারবহির্ভূত তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড সম্ভবত বিধেয়। আমি তাদের কথার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করতে পারিনি; আবার জোর প্রতিবাদও জানাতে পারিনি।

দেশের মানুষ কতটা ত্যক্ত-বিরক্ত হলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে, তার প্রমাণ পেয়েছি সাম্প্রতিককালেও। ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মী বলে পরিচিত একশ্রেণীর দুর্বৃত্তের নিত্য চাঁদাবাজি, লাইসেন্সবাজি, অপহরণ, হত্যার খবর পাঠে আওয়ামী লীগের গোঁড়া সমর্থক এক প্রৌঢ় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমার কাছে এই বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যে, এদের ক্রসফায়ারিংয়ে হত্যা করা হয় না কেন? এদের গ্রেফতার করে লাভ নেই। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে এরা মুক্তি পেয়ে যায় এবং এদের বিচার হয় না। দেশের জনমত জরিপ করা হলে হয়তো দেখা যাবে এক বিপুলসংখ্যক মানুষ এ প্রৌঢ় শিক্ষকের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।

নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডটি র‌্যাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ক্রসফায়ারিংয়ে বিচারবহির্ভূত সন্ত্রাসী হত্যার অভিযোগগুলোর পর্যায়ে পড়ে না। এটি একটি বড় ধরনের সামাজিক অপরাধ এবং এ অপরাধে র‌্যাব সাংগঠনিকভাবে জড়িত বলে অভিযুক্ত হয়নি। র‌্যাবের একাধিক অফিসার ব্যক্তিগতভাবে এবং ব্যক্তিগত লোভে এ অপরাধে জড়িত বলে অভিযুক্ত। সুতরাং এ অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক হলে তাদের কমন ক্রিমিনাল হিসেবে বিচারে সোপর্দ ও দণ্ড হওয়া উচিত। গোটা র‌্যাব প্রতিষ্ঠানকে তার জন্য দায়ী করা উচিত হবে না। র‌্যাবেরও উচিত হবে না এই অভিযুক্তদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানো। বরং তাদের বিরুদ্ধে যে গুরুতর অভিযোগ, সে সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্তে সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা উচিত। র‌্যাবের সুনাম রক্ষার স্বার্থেই অভিযুক্ত অফিসারদের দ্রুত কাস্টোডিতে নেয়া উচিত ছিল।

র‌্যাবের বিলুপ্তি আমি কামনা করি না। তাতে দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে না। বরং ভয়ানকভাবে বেড়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটবে। যেসব পশ্চিমা দেশ এখন বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে বলে নিজেরা সাধু সেজে প্রচার চালাচ্ছে, তাদের দেশে কী ঘটেছে এবং ঘটে তা কি বিশ্ববাসীর অজানা? আইরিশ সন্ত্রাস দমনের নামে নির্বিচার গুলি চালিয়ে অসংখ্য আইরিশ নর-নারী হত্যা করেছে একসময় ব্রিটিশ পুলিশ। তখন তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নালিশ কারও কণ্ঠে শোনা যায়নি। ভারতে নকশাল সন্ত্রাস দমনের নামে ইন্দিরা সরকারের আমলে ১০ হাজারের বেশি নর-নারী হত্যা করেছে দেশের রিজার্ভ পুলিশ ও প্যারামিলিশিয়া। এ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরও তেমন কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে র‌্যাবের অভিযানে কখনও হত্যাকাণ্ড ঘটলেই এবং তাতে জনজীবনের ভয়ানক শত্রু মারা গেলেও আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যার নামে শোরগোল তুলি।

আমি নিজে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘোর বিরোধী। এমনকি সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডদান প্রথারও বিরোধী। কিন্তু জনজীবনের ভয়ানক শত্রুকে যখন বিচার নাগাল পায় না; রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে সে বিচারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, তখন তার আকস্মিক ও আপত্তিকর মৃত্যুও জনজীবনে স্বস্তি ও সন্তোষের ভাব সৃষ্টি করে। কাগজে খবর পড়েছি, ভারতের রাজস্থানে এক সিরিয়াল রেপিস্ট ও কিলারকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাচ্ছিল। সে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে গেলে স্থানীয় মানুষ তাকে ধরে ফেলে এবং তাদের প্রহারেই অপরাধীর মৃত্যু ঘটে। এটাও বিচারবহির্ভূত হত্যা। কিন্তু তাতে কেউ ক্ষুব্ধ হননি। কারণ এই একটি মৃত্যুতে ১০টি জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ ফিরেছে।

বাংলাদেশে বিচার কোথায়, আইনের শাসন কোথায় যে আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করব? এত অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, রোজ ব্যবসায়ী খুন, সাংবাদিক দম্পতি হত্যা চলছে- কোথায় অপরাধী ধরা পড়েছে বা ধরা পড়লেও তার বিচার বা দণ্ড হয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। তাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার নামে বিলাপ না জুড়ে আমাদের সুশীল সমাজের উচিত দেশে আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে জোর আন্দোলনে নামা। মহসীন হলের সাত হত্যাকাণ্ডের নায়ক শুধু কারামুক্তি নয়, ক্ষমতাসীনদের কৃপায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পায়। একাধিক নৃশংস খুনের মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারে সোপর্দ না হয়ে রাজনৈতিক নেতা হয় এবং তার গাড়িতে মন্ত্রিত্বের পতাকা ওড়ে। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই কি সবচেয়ে বড় সমস্যা?

আমার সঙ্গে অনেকেই হয়তো সহমত পোষণ করবেন না, কিন্তু আমি র‌্যাবের বিলুপ্তি চাই না। চাই সংগঠনটির সংস্কার। এটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেয়া হোক। কিন্তু বিলুপ্তি নয়। নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত দায়িত্বে যুক্ত থাকতে পারেন, কিন্তু র‌্যাব তাতে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত নয়। সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার অপরাধ করলে তাদের বিচার হয়; গোটা সেনাবাহিনীর বিলুপ্তি কেউ দাবি করবে না। তেমনি র‌্যাবের কোনো কর্মকর্তা অপরাধ করে থাকলে দেশের প্রচলিত আইনেই তার বিচার হোক এবং কঠোর দণ্ড হোক। কিন্তু‘ নারায়ণগঞ্জের ঘটনাকে পুঁজি করে বিএনপির ফায়দা লোটার চেষ্টা এবং র‌্যাবের বিলুপ্তি দাবি করা দেশের বা দেশবাসীর জন্য কল্যাণকর হবে না।

র‌্যাব-জাতীয় প্রতিষ্ঠান উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও আছে। বড় বড় অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে তাদের ডাক পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার বাড়াবাড়ির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করার কথা ওঠে না। বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা না পাওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানের দরকার আছে। সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে, র‌্যাব যাতে তার বিশেষ ক্ষমতার অপব্যবহার না করে। জনজীবনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে গিয়ে যেন সেই শান্তি ও স্বস্তিতে ব্যাঘাত না ঘটায়।

এত বড় বিডিআর বিদ্রোহের পরও বিডিআর বিলুপ্ত করা হয়নি। বরং নতুন নামে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করা হয়েছে। র‌্যাব বা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকেও সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হোক। অভিসম্পাত নয়, র‌্যাব জনজীবনে আশীর্বাদের মতো টিকে থাকুক।

You Might Also Like