মূসা ভাইকে যেমন জেনেছি-দেখেছি

এবিএম মূসা পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তবু আমি দারুণভাবে ব্যথিত হয়েছি। পরের দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর জানাজায় শরিক হতে গিয়ে যানজটে আটকে সময়মতো পৌঁছাতে পারলাম না। পুরোটা দিন মনটা অত্যন্ত খারাপ ছিল।

এবিএম মূসার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় ১৫ বছর আগে, যদিও তাঁর ক্ষুরধার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। যৎসামান্য লেখালেখি আর বহু সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর কিছুটা কাছাকাছি আসার। পরিচয় নিবিড় হয় যখন ২০০৭ সালে আমি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে অন্যতম কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। প্রথম কয়েকজনের মধ্যে মূসা ভাই আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন জাতীয় এই দায়িত্ব আমি দক্ষতার সঙ্গেই পালন করতে পারব। তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের পর থেকে বিভিন্নভাবে মূসা ভাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাকে প্রচুর সহযোগিতা করছিলেন। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে যখন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করি, তখন মূসা ভাই রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা থেকেও আমরা বহু সুপারিশ পেয়েছিলাম। তিনি আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন।

আমরা নির্বাচন কমিশন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর তিনি নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে আমার কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আমার মনে পড়ে, ভোট গ্রহণের সপ্তাহ খানেক আগে এক টক শোতে তিনি বলেছিলেন যে জনগণ ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ভোট দিলেও তিনি জিতবেন না। পরের দিন আমি ফোনে তাঁর এমন মন্তব্যের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি অতীতের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। আমি তাঁকে আবার আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে, আমাদের জানামতে এমন হয়নি।

মূসা ভাইয়ের এই আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে আমরা যথেষ্ট সতর্ক হয়েছিলাম। আমরা একাধিকবার নারায়ণগঞ্জ সফর করি। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু কিছু জায়গা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিহ্নিত করি, যার মধ্যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মিজমিজি নামক কেন্দ্রটিও ঘুরে দেখি। জায়গাটি অনেকটা বিচ্ছিন্ন। এসব জায়গায় যথেষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
ভোট গ্রহণের দিন দুপুরের দিকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অফিসে এসে নারায়ণগঞ্জের ভোটের গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এ সময় আমার মুঠোফোনে একটি ফোন আসে, ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে মূসা ভাইয়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে জানালেন যে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক তাঁকে জানিয়েছেন যে মিজমিজির কেন্দ্রগুলো একজন প্রার্থীর সমর্থকেরা দখল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আমি তাৎক্ষণিকভাবে জানালাম এমনটা হলে অথবা একটা জাল ভোট পড়লে আমরা ওই কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেব। তাঁকে আরও আশ্বস্ত করেছিলাম যে বিষয়টি এক্ষুনি খতিয়ে দেখা হবে। আমার সামনে উপবিষ্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার বৃত্তান্ত শুনে আমাকে ব্যবস্থা নিতে বললেন। আমি জানতাম ওই চৌহদ্দি দখল হলে ভোটের অঙ্ক পাল্টে যাবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে মূসা ভাইয়ের আশঙ্কা এবং অভিযোগের বিষয়ে আলোচনার পর তাৎক্ষণিক আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত র‌্যাবসহ একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অকুস্থলে যেতে নির্দেশ দিয়ে কমিশনে ওই কেন্দ্রের অবস্থার কথা জানাতে বললাম। সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারাতে মিজমিজির ভোট গ্রহণ নির্বিঘ্নে হয়েছিল। সেদিন সময়মতো মূসা ভাইয়ের তথ্য না পেলে হয়তো বা নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে খুঁত থেকে যেত।
মানুষ চলে যায়। মৃত্যুর স্বাদ নিতে হয়, এটাই সবচেয়ে বড় সত্য। ভেবেছিলাম পূর্বঘোষিত সংসদ ভবনের প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজায় শরিক হতে পারব কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। দুঃখ থাকবে, শেষ দেখা হলো না। আমার মুঠোফোনের ফোনবুকের প্রথম নামটি ‘এবিএম মূসা’। এই নামে আর কেউ কোনো দিন আমাকে ফোন করবেন না। তবু নামটি আমার ফোনবুকে থাকুক।
এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
(প্রথম আলো, ২২/০৪/২০১৪)

You Might Also Like