চলে গেলেন বশির আহমেদ

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী বশির আহমেদ আর নেই। গত শনিবার রাত ১০ টায় তিনি মোহাম্মদপুরস্থ জহরী মহল্লায় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি …….রাজেউন) । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো প্রায় ৭৫ । মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী মিনা বশির, এক ছেলে এক মেয়ে রাজা বশির ও হোমায়েরা বশিরসহ বহুগ্রণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। গতকাল রবিবার সকাল আটটায় নামাজে জানাজা শেষে তাকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুতে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একজন বশির আহমেদকে ছাড়া আমাদের দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের ইতিহাসের কথা ভাবাই যায়না। দীর্ঘদিনের সঙ্গীত ক্যারিয়ারে অনেক গান গেয়েছেন তিনি। এ প্রজন্মের শ্রোতারা হয়তো তাকে শুধু নামেই চিনেন। কিন্তু খুজে খুঁজে জনম গেলো, পিঞ্জর খুলে দিয়েছি , ডেকোনা আমারে তুমি কাছে ডেকোনা, আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো, অনেক সাধের ময়না আমার কিংবা সজন গো ভালোবেসে এতো জ্বালা কেন বলনা-এসব গান সত্যিকার অর্থেই একজন বশির আহমেদকে খুব সহজে ষাটের দশকের শ্রোতা থেকে শুরু করে আজকের প্রজন্মের শ্রোতাদের সামনে খুব সহজেই তুলে ধরে। বশির আহমেদ আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনের বিশেষ করে চলচ্চিত্রের গানের গর্ব। একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী বশির আহমেদ ঢাকার মোহাম্মদপুরের জহরী মহল্লায় বসবাস করতেন।  রাজা মেহেদী আলী খানের কথায় এবং মোহাম্মদ শফির সঙ্গীত পরিচালনায় বশির আহমেদ সর্বপ্রথম মুম্বাইয়ের আবুল হাসান চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করি। তখন তার বয়স হবে ১৯ কিংবা বিশ বছর। এরপর ‘জিন্দেগী’সহ আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে ওখানে তিনি ওখানে প্লে-ব্যাক করেন। গান নিয়ে তার তেমন কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিলোনা। বশির আহমেদের বাবা নাসির আহমেদ এবং মা মোমনো খাতুন। দুজনই প্রয়াত। ১৯৩৯ সালের ১৮ নভেম্বর কলকাতা শহরে আমার বশির আহমেদের জন্ম। ছোটবেলায় তার মা তাকে ঘুমপাড়ানির গান শুনিয়ে শুনিয়ে যখন ঘুম পাড়াতেন, সেই সময় থেকেই মূলত গানের প্রতি তার এক ধরনের আগ্রহ জন্মায়। দিন দিন বড় হতে থাকলেন তিনি, গান গাওয়ার প্রতিও তার আগ্রহ প্রবলভাবে বাড়তে থাকলো। পড়াশুনার পাশাপাশিই তিনি গান গাইতেন। বাবা কিংবা মা কেউই তাতে বাধা দিতেন না। ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন বাঁকার কাছেই তার গানে হাতেখড়ি এবং দীর্ঘদিনের চর্চা। পরে অবশ্য আমি ওস্তাদ বাড়ে গোলাম আলী খাঁর কাছে অনেকদিন তারশি নিয়েছিলেন। তো এভাবে এক সময় চর্চা চলতে থাকাকালীন সময়ে ছবিতে গান গাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বোম্বেতে যেখানে শিল্পীরা থাকেন সেখানে গেলেন তিনি। অপিরিচত জায়গায় এসে তিনি দিশেহারা হয়ে যান। ঘুম থেকে উঠে পরেরদিন সকালে তারই এক বন্ধূর সাথে দেখা। তিনিই এক সময় তাকে গীতিকার রাজা মেহেদী আলী খানের কাছে নিয়ে যায়।

Bashir vaia 4

এভাবেই তার বোম্বের ছবিতে গান গাওয়াটা শুরু। পরে কয়েকটি ছবিতে গান গাওয়ার পর তিনি মা বাবার টানে কলকাতায় চলে আসেন।  গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক দোষানী এক সময় অতার সাথে এবং তালাত মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করেন যে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলা শহরে গানের অনুষ্ঠানে গান গাইতে হবে। তারা সে অনুযায়ী এক সময় ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকাসহ সিলেট, রাজশাহী, কুমিল্লাসহ আরো কয়েকটি জেলাশহরে গান গাইলেন। একদিন পরিচালক এহতেশামের ভাই ম্স্তুাফিজ সাহেব আমার সাথে যোগাযোগ করলেন। সে সময় দুটি ছবির কাজ এক সাথে শুরু হয়। একটি মুস্তাফিজ’র ‘তালাশ’ ও অন্যটি এহতেশাম’র ‘রাজধানীর বুকে’। রাজধানীর বুকে ছবিতে গাইলেন তালাত মাহমুদ। রবিন ঘোষের সুরে ‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’। এরপরপরই তার উপর দায়িত্ব পড়লো ‘তালাশ’ ছবির গান লেখার এবং গাওয়ার। তিনি তখন বি এ দীপ নামে ছবির সবগুলো গান উর্দুতে লিখেছিলেন। রবিন ঘোষের সুরে এই ছবিতে তিনি গাইলেন। সবগানই শ্রোতা সমাদৃত হয়। এভাবেই ঢাকার ছবিতে তার প্লে-ব্যাক শুরু।  এরপর তিনি নায়ক রহমানের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘দর্শন’ এর সঙ্গীত পরিচালনা করার দায়িত্ব পান। এই ছবির নয়টি গানই সুুপারহিট হয়। এই ছবিতে রহমানের বিপরীতে ছিলেন শবনম। নায়ক রহমানের সাথে তার খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। যে কারণে রহমান কি চাইতেন তা বুঝতেন। এরপর কাজী জহিরসহ আরও অনেকের ছবির জন্য গান গেয়েছেন তিনি। তবে যারে যাবি যদি যা কিংবা আমাকে পোড়াতে যদি এতোলাগে ভালো-এসব গান রেডিওতে তার প্রথম গাওয়া। রেডিওতে জনপ্রিয় হবার পর সেসব গান ছবিতে সংযুক্ত করা হয়েছে গল্পের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী। পাকিস্তানের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী নূরজাহানের মতো একজন শিল্পীর সাথে বশির আহমেদ গান গেয়েছেন। তার সাথে গাওয়া ‘তুমজো মিলে পেয়ার মিলা’ কিংবা ‘চুনলিয়া এক ফুলকো’ গান ব্যাপক হিট হয়। বরেণ্য এই কন্ঠশিল্পী একুশে পদকের পাশাপাশি চিত্রনায়িখা মৌসুমী পরিচালিত ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য ২০০৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

ছবি : আসলাম হাবিব

You Might Also Like