‘গণজাগরণ….’ একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

হঠাৎ করে আবারও আলোচনায় ‘গণজাগরণ’।বিরুপ আলোচনায়। তবে কোনো প্রতিপক্ষের নয়, নিজেরাই নিজেদের পেছনে লেগেছে। প্রকাশ্যে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে তারা। এক উপ-দল অন্য উপ-দলকে অব্যাহতি দিচ্ছে, এক উপ-দল অন্য উপ-দলের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ থেকে নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তুলছে। গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে রাজনীতি করার এবং অবৈধ পন্থায় ফায়দা হাসিল করার অভিযোগ তুলতেও প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা। ক্ষমতাসীনরাও।

দুটি হাসপাতালকে অবরুদ্ধ করে দিনের পর দিন আন্দোলনের নামে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা নিতে বাধা দেয়ার মাধ্যমে তারা যে মহা-অন্যায় করেছে এবং এভাবে কর্মকাণ্ড চালানো যে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন এডভোকেট কামরুল ইসলাম। কিন্তু গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণজাগরণওয়ালারা যখন রাজপথ দখল করে নিয়েছিল, তখন এই একই এডভোকেট সাহেব তাদের সমর্থনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছিলেন। তিনি তখন আইন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ‘আইনের মানুষ’ হলেও তখন কিন্তু গণজাগরণওয়ালাদের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ বা আইনবিরোধী মনে করেননি। এর কারণও এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। গণজাগরণওয়ালারা সেসময় সরকারের একটি পারপাস পূরণ করেছিল।

তখন ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্দেশ্য, কৌশল ও অবস্থান তো পরিষ্কার ছিলই, পাশাপাশি পালাক্রমে সে কাতারে শামিল হয়েছিলেন হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদার, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মুনতাসির মামুন, শ্যামল দত্ত, অঞ্জন রায় প্রমুখও। ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ার কবির পর্যন্ত চিহ্নিতজনদের প্রত্যেকেই এসেছিলেন রাখঢাক না করে। ‘তরুণ প্রজন্মের’ পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতারা- যাদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের সময় রহস্যময় ভূমিকার কারণে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ‘কাপুরুষ’ হিসেবে বর্ণিত জেনারেল শফিউল্লাহও। তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও জোরেশোরেই জানান দেয়া হয়েছিল। সেটা তারা দিতেই পারেন। কিন্তু আপত্তি উঠেছিল কিছু বিশেষ কারণে। দাবি জানানোর নামে প্রকাশ্যে আদালত অবমাননা এরকম একটি কারণ। আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায় প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বন্দি সব নেতাকে সরাসরি ফাঁসির আদেশ দেয়ার জন্য রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল গণজাগরণওয়ালারা। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিদের কাছ থেকে তারা গায়ের জোরে রায় আদায় করার চেষ্টা চালিয়েছে। অথচ তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষ্য, জেরা প্রভৃতির ভিত্তিতে যে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অধিকার রয়েছে ট্রাইব্যুনালের। শুধু ফাঁসিই কেন, বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড যেমন দিতে পারেন, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কাউকে মুক্তি দেয়ারও অধিকার রয়েছে ট্রাইব্যুনালের। অন্যদিকে ‘তরুণ প্রজন্ম’কে দিয়ে এমনভাবেই দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল যাতে এক ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো সাজা দেয়ার কথা মাননীয় বিচারপতিরা বিবেচনাও না করতে পারেন। বলাবাহুল্য, এর ফলে মাননীয় বিচারপতিদের ওপর শুধু প্রচণ্ড মানসিক চাপেরই সৃষ্টি হয়নি, দেশের বিচারব্যবস্থাও একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। এজন্যই কথা উঠেছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে। বলা হচ্ছে, রায়টি দেয়া হয়েছে শাহবাগীদের তথা গণজাগরণওয়ালাদের চাপের মুখে।

‘তরুণ প্রজন্মের’ দাবিগুলোও লক্ষ্য করা দরকার। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদের কাছে তারা যে ছয় দফা দাবি পেশ করেছিল, তার কোনো একটিকেই অরাজনৈতিক বা নির্দলীয় কোনো সাধারণ গোষ্ঠীর দাবি বলা যায় না। ছয় দফায় কথিত যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যেককে ‘সর্বোচ্চ’ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসি দেয়ার দাবি তো ছিলই, একই সঙ্গে ছিল আইন পরিবর্তন করার দাবিও। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার জন্যও দাবি জানিয়েছিল ‘তরুণ প্রজন্ম’। বলেছিল, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও নিষিদ্ধ করতে হবে- যেগুলোর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ধরনের দাবি কোনো অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর হতে পারে না। তখনকার মাননীয় স্পিকারও জনগণকে স্তম্ভিত করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে কোনো গোষ্ঠী চাইলেই তাদের কাছ থেকে দাবির ফিরিস্তি গ্রহণ করা যায় না। তাছাড়া শাহবাগ চত্বর থেকে যারা গিয়েছিল তারা জনগণের তো নয়ই, এমনকি কথিত ওই ‘তরুণ প্রজন্মের’ও প্রকাশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল না। অন্যদিকে অমন একটি গ্রুপের কাছ থেকেই স্মারকলিপি নিয়েছিলেন তখনকার মাননীয় স্পিকার। ওদিকে সংসদের ভেতরে ঝড় তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘তরুণ প্রজন্ম’ নামধারীরা যেদিন স্মারকলিপি পেশ করেছিল, সেদিনই অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারিই জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘দৃষ্টি আকর্ষণ করে’ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তাদের (অর্থাৎ মাননীয় বিচারপতিদের) অনুরোধ করবো, মানুষের আকাক্সক্ষা তারা যেন বিবেচনায় নেন। অর্থাৎ তারা যেন ‘সর্বোচ্চ’ শাস্তিই দেন! প্রধানমন্ত্রী শুধু ‘অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত’ স্মারকলিপির প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেননি, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, টেলিভিশনে তরুণদের দেখে এই ‘বৃদ্ধ বয়সে’ তারও নাকি শাহবাগে ‘ছুটে যাওয়ার’ এবং গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলানোর ইচ্ছা জেগেছে! প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছিলেন, এতদিনে তার পথচলা নাকি ‘সার্থক’ হয়েছে! এখন তিনি নাকি খুব ‘স্বস্তিতে, শান্তিতে ও নিশ্চিন্তে’ মরতে পারবেন! প্রধানমন্ত্রী তার কথাও রেখেছিলেন। শাহবাগে ‘ছুটে’ না গেলেও প্রজন্মওয়ালাদের দাবি অনুযায়ী মানবতাবিরোধী বিচারের জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। তার নির্দেশে মাত্র দুদিনের মধ্যে আইনমন্ত্রী সংসদে বিল পেশ করেছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একদিনের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পাস করার জন্য ফেরত পাঠিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের জন্য আপিলের অধিকার রেখে সংশোধিত আইনটি গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পাসও হয়েছে। পাস করার সময় লাফিয়ে এসেছিলেন বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেনন। তার দাবি অনুযায়ী ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের বিচারের বিষয়টিকেও আইনে যুক্ত করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর তোড়জোরও শুরু হয়ে গেছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। বলা দরকার, এটাও নিরীহ ‘তরুণ প্রজন্মের’ তথা গণজাগরণওয়ালাদেরই দাবি ছিল!

ঘটনাপ্রবাহে ‘তরুণ প্রজন্ম’ নামধারীদের ফ্যাসিস্টসুলভ বক্তব্য এসেছিল আপত্তির অন্য এক কারণ হিসেবে। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে তো বটেই, শাহবাগের সমাবেশ থেকে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও ফ্যাসিস্টের সুরে দিনের পর দিন ধরে ভয়ঙ্কর হুমকি উচ্চারিত হয়েছিল। শেষ কয়েকদিনে মনেই হয়নি, শাহবাগ নাটকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কথিত যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি আদায়ের দাবি জানানো- যেমন, ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে এরকম এক ঘোষণায় তরুণ প্রজন্মের নেতারা বলেছিল, শাহবাগের নাটক সম্পর্কে আর একটা ‘উল্টাপাল্টা কথা’ লিখলে দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদককে ‘খতম’ করা হবে। টিভি টকশোর জনপ্রিয় দুই আলোচক অধ্যাপক পিয়াস করিম ও ড. আসিফ নজরুলের ‘পিঠের চামড়া’ তুলে নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিল তারা। সাবধান করতে গিয়ে বলেছিল, ‘কুলাঙ্গার’ দুজন শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে ‘উল্টাপাল্টা কথা’ বললে তাদেরও ‘নির্মূল’ করা হবে, ‘পিঠের চামড়া’ তো থাকবেই না। আমার দেশ-এর পাশাপাশি দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম এবং দিগন্ত টিভির বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল গণজাগরণওয়ালারা। এসব গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ‘প্রতিহত’ করার ঘোষণাও দিয়েছিল তারা। শুধু তা-ই নয়, মুহুর্মুহু স্লোগানের মধ্য দিয়ে এ কথাও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, শাহবাগের ওই সমাবেশ থেকে হুমকি ও ঘোষণা এসেছিল সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। হুমকির ধারাবাহিকতায় শাহবাগের নতুন প্রজন্ম তাদের দাবির মধ্যেও পরিবর্তন এনেছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টিকে অনেকাংশে ‘শিকেয় তুলে’ সিরিয়ালের এক নম্বরে তারা মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে এসেছিল। সবকিছু ফেলে তাদের আগে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করানো দরকার হয়ে পড়েছিল! এজন্য প্রথমে তারা ২৪ ঘণ্টার ‘আল্টিমেটাম’ দিয়েছিল। তারপর বলেছিল, তাকে ‘অবিলম্বে’ গ্রেফতার করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারও এ ব্যাপারে জবরই দেখিয়েছিল। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ প্রহরায় রীতিমতো রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দিয়ে নতুন প্রজন্মের স্বঘোষিত নেতাদের সচিবালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের কাছ থেকে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা আলমগীর শুধু স্মারকলিপি গ্রহণ করেননি, মাহমুদুর রহমান এবং তার সক্রিয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘এখনই’ ব্যবস্থা নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিলেন। বুঝতে বাকি থাকেনি, তরুণ প্রজন্ম নামধারীরা আসলেও সরকারকে ‘উদ্ধার’ করার জন্যই ময়দানে নেমেছিল। কারণ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে দুর্নীতি, ব্যর্থতা ও দুর্নামের পরিণতিতে সরকার ততদিনে এক মারাত্মক পরিস্থিতির মুখে এসে গিয়েছিল। নিন্দিত হচ্ছিল দেশে-বিদেশে। এদিকে আবার মেয়াদের শেষ বছরেরও দিন গণনা শুরু হয়েছিল। ক্ষমতাসীনরা তাই অতি কূটিল কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। শাহবাগের তরুণ প্রজন্মও নিতান্ত গর্দভের মতো সেবাদাসের ভূমিকাই পালন করেছিল।

তরুণ প্রজন্ম নামধারীরা হঠাৎ কেন মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ ও সংগ্রামসহ দেশপ্রেমিক গোষ্ঠীকে প্রধান টার্গেট বানিয়েছিল- তার কারণ লক্ষ্য করা দরকার। উত্তর জানার জন্য ইসলাম ও মুসলিম বিরোধিতার উল্লেখ করতেই হবে। এ ব্যাপারেও অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছিল শাহবাগ মঞ্চের কুশীলবরাই। তরুণ প্রজন্ম নামের আড়ালে তারা আসলে এমন একটি গোষ্ঠী, যারা বহুদিন ধরে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল। মহান আল্লাহ, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র আল-কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত অসভ্য ভাষায় মন্তব্য করার ও কুৎসা রটানোর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম নামধারী এই ব্লগাররা প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুচিন্তিতভাবে বিষোদগার করে এসেছে। চালিয়েছে বিরামহীন সাইবার ওয়ার। যে ধরনের ভাষা ও শব্দ তারা ব্যবহার করেছে, সেসবের কোনো একটিও ধর্মপরায়ণ কোনো মুসলমানের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। ওই ব্লগাররা কিন্তু শুধু ইসলাম ও মুসলমানবিরোধী কটূক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের আইন ও আদালতের প্রতিও তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিল। আগের বছর ২০১২ সালের মার্চে দেয়া একটি রায়ে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা চিহ্নিত ইসলামবিরোধী ব্লগগুলো বন্ধ করাসহ ব্লগার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। গোয়েন্দারা একজন ব্লগারকে গ্রেফতার করার পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাকে শুধু ছেড়েই দিতে হয়নি, গ্রেফতারকারী গোয়েন্দাদের উল্টো ক্ষমাও চাইতে হয়েছিল।

ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার গোষ্ঠীও সরকারের এ মনোভাবের সুযোগ নিতে ভুল করেনি। প্রচারণা বন্ধ করার কিংবা সংযত হওয়ার পরিবর্তে ব্লগাররা বরং নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আরো জোরদার করেছিল। তারা একই সঙ্গে উচ্চ আদালতের প্রতিও প্রকাশ্যে অবজ্ঞা দেখিয়েছে- যেমন, ২০১২ সালের ২১ মার্চ রায় ঘোষিত হওয়ার পর আসিফ নামের একজন ব্লগার ‘সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে’ যুক্তিহীন ধর্মীয় অনুভূতির ‘রক্ষক’ আদালত অবমাননার ঘোষণা দিয়েছিল। উচ্চ আদালত সম্পর্কে কুৎসিত ভাষা ও শব্দেও অনেক মন্তব্য করেছে ব্লগাররা। অন্যদিকে ব্লগার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ধারেকাছে যাওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন, যারা ওই ব্লগারদের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ মুসল্লীদের ওপর যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হামলা চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে মাথা ঠাণ্ডা রেখে বর্ণনা দেয়াটা কঠিনই বটে। তরুণ প্রজন্ম নামের আড়ালে একটি নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী বহুদিন ধরে মহান আল্লাহ, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র আল-কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত অসভ্য ভাষায় যে ভয়ঙ্কর অপপ্রচার চালিয়ে আসছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য ১২টি ইসলামী ও সমমনা দল জুমার নামাজের পর প্রতিবাদ মিছিল করতে চেয়েছিল। এই কর্মসূচির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা ছিল না। অন্যদিকে সরকার নিয়েছিল প্রচণ্ড মারমুখী অবস্থান। পুলিশ মুসল্লীদের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঢুকতেই দিতে চায়নি। গেটগুলোতে তারা তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। কোনোভাবে নামাজ আদায় করলেও, বেরিয়ে আসামাত্র মুসল্লীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পুলিশ। পুলিশ বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে গুলী পর্যন্ত চালিয়েছে। বায়তুল মোকাররম থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে মৎস্য ভবন পর্যন্ত পুরো এলাকায় চলেছে এই তাণ্ডব। অনেক মুসল্লীকেই পুলিশের লাথি খেতে হয়েছে। পুলিশ লাথি মেরেছে এমনকি পিতার বয়সীদেরও। রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় পুলিশ একই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে মুসল্লীদের লাঠিপেটা করেছে। টিয়ার গ্যাসতো ছুঁড়েছেই, কয়েকশ’ রাউন্ড গুলীও করেছে। এসব গুলীতে মুসল্লীরা শুধু নন, সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষও আহত হয়েছিলেন। একই উদ্দেশ্য থেকে পুলিশ মানিকগঞ্জের সিংগাইরে হত্যা করেছিল চারজনকে। ঘটনাপ্রবাহের ওই পর্যায়ে মাত্র ১১ দিনে পুলিশ ১৭ জনের লাশ ফেলেছিল। এরপর এসেছিল মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা-উত্তর পরিস্থিতি। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কম করে হলেও ৮০ জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছিল পুলিশ। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল সুনির্দিষ্টভাবে। না হলে পুলিশের পক্ষে এতটা নিষ্ঠুরতা দেখানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়।

এভাবে হত্যাসহ নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি আমার দেশ সম্পাদক ও তার ‘সক্রিয়’ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘এখনই’ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছিল সরকার। অথচ গণতন্ত্রের পাশাপাশি ৯০ ভাগ অধিবাসী মুসলমানদের ধর্মের ব্যাপারে সদিচ্ছা থাকলে সরকারের উচিত ছিল প্রথমে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। কারণ সর্বাত্মক উস্কানি তারাই দিয়েছিল। ধর্মপরায়ণ মুসলমানদের অনুভূতিতে চরমভাবে আঘাত করার মধ্য দিয়ে সাইবার ওয়ারের সূচনাও তারাই করেছিল। অন্যদিকে মন্ত্রীরা কিন্তু তাদের ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরং নতুন প্রজন্মকে ‘অনুসরণীয়’ হিসেবে সাবাশই দিয়েছিলেন, কথার মারপ্যাঁচে তাদের ঘাড়েও তুলেছিলেন। ওদিকে অনেকাংশে অনুগ্রহ দেখানোর ঢঙে মাঝখানে তথ্যমন্ত্রী একদিন জানিয়েছিলেন, ইসলামবিদ্বেষী কয়েকটি ব্লগ বন্ধ করে দেয়ার জন্য তিনি নাকি বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। সত্যি তিনি তেমন কোনো নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা এবং দিলেও বিটিআরসি সত্যি কোনো ব্লগ বন্ধ করেছিল কিনা- সে বিষয়ে কিন্তু জানা যায়নি। তাছাড়া ইসলামবিদ্বেষীরা এতটাই বাড়াবাড়ি করতে উঠেপড়ে নেমেছিল যে, কয়েকটি মাত্র ব্লগ বন্ধ করলেই তাদের প্রচারণা বন্ধ হয়ে যেতো না। তারা বরং নিত্য-নতুন ব্লগের মাধ্যমে আরো বেশি উস্কানি দিয়েছে। এজন্যই শুধু বন্ধ করার আশ্বাস তখন যথেষ্ট ছিল না, উচিত ছিল সত্যি সত্যি বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া। ওই সময়ের মধ্যে যারা ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেও একযোগে ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু সেটা নেয়া হয়নি বলেই জনগণকে যেমন বিশ্বাস করানো যায়নি, তেমনি প্রশমিত করা যায়নি সামাজিক অস্থিরতাকেও যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ক্রমাগত জোরদার হয়ে উঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণ প্রজন্ম নামধারী ব্লগাররা কিন্তু গণতন্ত্রসম্মত সমালোচনা বা শালীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হুমকিও তারাই বেশি দিয়েছিল। কিন্তু এদের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তাদের প্রতি উল্টো উদারতাই দেখানো হয়েছে। অথচ ব্লগাররা শুধু ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধেই সাইবার ওয়ার চালায়নি, দেশের উচ্চ আদালতকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। তা সত্ত্বেও সব জেনে-বুঝেই নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার গাষ্ঠীকে সমর্থন-সহযোগিতা দেয়ার মাধ্যমে শুধু নয়, তাদের দিয়ে শাহবাগ নাটক সাজানোর মাধ্যমেও ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ইসলামবিরোধী উদ্দেশ্যের ন্যক্কারজনক প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। সরকার পুলিশকে দিয়ে ধর্মপরায়ণ মুসলমানদেরও হত্যা করিয়েছে। এমন নীতি ও কর্মকা- কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। তখনই বলা হয়েছিল, এই সত্য ভুলে যাওয়ার পরিণতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ শুধু মুসলমান নন, ধর্মপরায়ণ, অসাম্প্রদায়িক ও সংগ্রামী মানুষও। নিজেদের অধিকার রক্ষা ও আদায় করার জন্য যুগে যুগে তারা সংগ্রাম করে এসেছেন। সংগ্রাম যে চালিয়ে যাবেনই, তারও প্রমাণ দিয়েছেন তারা। সেটা ক্ষমতাসীনরাও বুঝতে পেরেছিলেন। এমন অবস্থায় উচিত যেখানে ছিল নীতি-সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আনা এবং জনগণের আকাঙ্খার প্রতি সম্মান দেখানো, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা তখন উল্টো পথে এগিয়েছিলেন। অতি সম্প্রতি অবশ্য প্রকাশ্য অবস্থানে তাদের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত তাদের ইঙ্গিতেই সংঘাত শুরু হয়েছে গণজাগরণওয়ালাদের মধ্যে। বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, কাজ ফুরিয়ে গেলে অর্থাৎ উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেলে- সেবাদাস তথা চাকর-বাকরদের বিদায় করা হয়। প্রয়োজনে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে মালিক পক্ষ। একই কারণে গণজাগরণওয়ালারাও সম্প্রতি ধাওয়ার মুখে পড়েছে। এখানে-সেখানে পিটুনিও খাচ্ছে তারা। এতে অবশ্য দেশপ্রেমিকদের খুশি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ গণজাগরণওয়ালাদের সামনে রেখে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে তছনছ করে ফেলা হয়েছে। আদালতের আড়ালে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে হত্যা করা হয়েছে। সামনে সম্ভবত রয়েছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পালা। তারপর আরো কতজনকে যে ফাঁসির মঞ্চে উঠানো হবে, তা দেখার জন্য শুধু অপেক্ষা!

(আহমদ আশিকুল হামিদের নিবন্ধন থেকে অংশ বিশেষ)

You Might Also Like