পঞ্চম পর্বের উপজেলা নির্বাচন

আমার এ লেখা যেদিন পত্রিকায় ছাপা হয়ে পাঠকের হাতে যাবে, সেদিন পঞ্চম ও শেষ পর্বের উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচন কেমন হবে? ভালো কিছু দেখতে পারব আমরা? ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন?

আমি এ লেখা লিখছি ২৯ মার্চ। পঞ্চম দফা নির্বাচনের দুই দিন আগে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাচনী প্রভাব ও বলপ্রয়োগের কথা শুনেছি। কিন্তু এখন এ নিয়ে কোনো কথা বলছি না। বলব, ৩১ তারিখের পর। এখন বলব চতুর্থ পর্বের অর্থাৎ এখন পর্যন্ত সর্বশেষ পর্বের নির্বাচনের কথা।

২৩ মার্চ চতুর্থ দফায় ৯১টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৯১টি উপজেলায় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু নির্বাচন হতে পেরেছে ৮৮টি উপজেলায়। পত্রিকা লিখেছে, কেন্দ্র দখলের নির্বিঘ্ন উৎসব ছিল এই দিন। ‘ডাকাতির’ ভোটে নিহত হয়েছে চারজন। ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। বোমাবাজি ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের মারধর করা হয়েছে। ব্যালট ছিনতাই হয়েছে। আহত হয়েছে ২০০-এর বেশি। সংঘর্ষের কারণে নির্বাচনের দিন রাত দেড়টা পর্যন্ত তিনটি উপজেলার ফলাফল জানা যায়নি। বাকি ৮৫টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ৫১, বিএনপির ২১ ও জামায়াতের ৫ জন জয়ী হয়েছেন।

পঞ্চম পর্বের উপজেলা নির্বাচন

শাবাশ আওয়ামী লীগ! শেষ পর্যন্ত যা মনে করা হয়েছিল, তা-ই হলো। আওয়ামী লীগ যে বিএনপির চেয়ে জনপ্রিয় দল, তা প্রমাণ করে ছাড়ল তারা। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৩৭৮টি উপজেলার ১৭১টিতে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। বিএনপি জিতেছে ১৪৪টি আর জামায়াত ৩২টি উপজেলায়।

আওয়ামী লীগ নেতারা নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছেন। এমনিতেই তাঁদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘অসাধারণ’ দৃঢ়তা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ তাঁরা। সবার কথা বলছি না। কোনো কোনো মাঝারি বা উচ্চ মাঝারি নেতাদের বলতে শুনেছি, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর শত্রুপক্ষকে ক্ষমা করে যে ভুল করেছিলেন, সে ভুল তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা করেননি। সে জন্য ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থেকেছে, ওরা আসতে পারেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের খুঁজে পাইনি। কারণ তাঁরা উপজেলা নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকায় গেছেন। কেন্দ্র বলেছে, এলাকায় যাও। কাজ করো। জিতে আসতে হবে। কথাটা যে নিখাদ খারাপ তা বলব না। ভোট তো মানুষ জেতার জন্যই করবে। কিন্তু এ কথার ভেতরের সুর যদি এ হয় যে জিতে আসতে না পারলে সর্বনাশ। একটি ইংরেজি দৈনিক শিরোনাম করেছে, আওয়ামী লীগের লোকজন কারচুপির ঘোড়ায় চড়েছে। আরেকটি শিরোনামে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচনকে বিশ্রামাগারে পাঠানো হয়েছে। পত্রিকাটির রিপোর্ট অনুযায়ী ৭০ শতাংশ ভোট প্রদান সম্পন্ন হয়েছে সকাল ১০টার মধ্যে। উপজেলা নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপি সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তিন দফা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করে যে প্রশাসনের সহায়তায় কেন্দ্র দখলের মহোৎসব করেছে আওয়ামী লীগ।

এ রকম যে হবে, এটা পর্যবেক্ষক মহল আগেই আঁচ করেছিল। পত্রিকাগুলো লিখেছিল, টেলিভিশনে টক শোগুলোতে অতিথি বক্তা, সমাজচিন্তকরা বলেছিলেন, অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছিলাম, তা ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুদূর আমেরিকা থেকে চিঠি লিখেছিলেন চতুর্থ পর্যায়ে উপজেলা নির্বাচনে সম্ভাব্য সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। তিনি আমেরিকায় কেন? কারণ সেই যে কথা আছে, ‘জিহ্বাগ্রে বসিয়াছে দেবী সরস্বতী; করো প্রশ্ন, মিলিবে উত্তর।’ আমাদের বর্তমান সরকার এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও হয়েছে সে রকম। কোনো কথা মাটিতে পড়তে দিচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনার একজন বলেছিলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকলেই বা কী হতো? তিনি কি এগুলো ঠেকাতে পারতেন?

একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! প্রধান নির্বাচন কমিশনারও কিছু করতে পারবেন না! তবে কে পারবেন? অথচ রবিবার ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাহাবুদ্দিন ইয়াকুব কোরাইশির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন।

সে যা হোক, আমাদের দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকিবউদ্দীন আহমদ দেশে থাকতে পারেননি। বিদেশ থেকে উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেছেন, যেন নির্বাচনে জবরদখল, সহিংসতা ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়। বোঝা যায়, বিদেশে গেলেও দেশের সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তিনি কতখানি উদ্বিগ্ন। বেচারা!

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এ কথা কি সরকার রেখেছিল? ভোটের দিন যশোর থেকে একজন আমাকে ফোন করে জানালেন, সেখানের একটি কেন্দ্রে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেনাবাহিনী ছিল না? তিনি জবাব দিলেন, ছিল। গোলাগুলির শব্দ শুনে তারা তাদের ছাউনিতে ফিরে গেছে।

সেনাবাহিনীকে কি বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল? বিএনপি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে যে উপজেলা নির্বাচনে লোকদেখানোর জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁরা বলেন, নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনীকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে বটে; কিন্তু তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে। গত শনিবার নির্বাচনী অনিয়ম ও সহিংসতা রোধে কঠোর হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার বাহিনীকে চিঠি দেয়। আর সেনাবাহিনীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩১ ধারা অনুসারে ক্ষমতা প্রয়োগের অনুরোধ জানিয়ে কমিশন বলে, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে গুলির ব্যবহার হবে; কিন্তু সেদিন অবাধে ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল নির্বিকার। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩১ ধারায় কী আছে, সেটা নির্বাচন কমিশন জানে। কিন্তু এ কমিশন তাদের প্রধানের পরামর্শ অনুযায়ী যে চিঠি দেয়নি, তা জানা যায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের কথায়। ২৩ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না। তবে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাঠক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে রকম চেয়েছিলেন, সে রকম করে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কী করার থাকতে পারে? প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে অবশ্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তি, এ কথা মনে করেন না প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তৃতীয় দফায় অনেক সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু দেখেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। তিনি এও বলেন, যেখানেই সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে।

‘ধরণী দ্বিধা হও’- এ কথা বলা ছাড়া আর কী করার আছে? তৃতীয় দফার নির্বাচনে মারা গিয়েছিল তিনজন। শ্রীপুরে একজন ছাত্রলীগকর্মীর মৃত্যু হয়েছিল কেবল আওয়ামী লীগের তৃণমূলকে উপেক্ষা করে ওপর থেকে প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। এবার একই ঘটনা ঘটেছে গজারিয়ায়। সেখানে একজনকে মনোনীত করেছিল তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। কিন্তু অন্যজন এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হয়েছিলেন- এ নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছিল। ভোটগ্রহণের দিন যার বলি হলেন আওয়ামী লীগের নেতা ও বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন প্রধান। কিন্তু এসবের কোনো কিছুতেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কিছু যায়-আসে বলে মনে হয় না।

গত ৫ জানুয়ারি সংসদীয় নির্বাচনের বলিদান হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে অসংখ্যবার নির্বাচনপ্রক্রিয়াকেই হত্যা করা হয়েছে। নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তৃণমূল নেতাদের জীবন দিতে হচ্ছে। তার পরও তারা বলছেন, সব কিছু সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। সেই যে প্রবাদ হয়ে গেছে, রোম যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। অনেকটা সে রকম।

আমি বলেছিলাম, সরকারি দলের জিহ্বার আগায় সরস্বতী বসেছে। এখন দেখছি, নির্বাচন কমিশনারের বেলায়ও একই রকম আছর। যথারীতি নির্বাচন কমিশনও এক প্রেস ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছিল, সেখানে ভারপ্রাপ্ত(?) প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক বলেন, ‘সহিংসতা না হওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি, প্রার্থনা করেছি, তা সত্ত্বেও কিছু কিছু কেন্দ্রে সহিংসতা হয়েছে।

এখানে অবশ্য সহিংসতার কথা খানিকটা স্বীকার করা হয়েছে, যদিও সেটাকে মাত্র কিছু কিছু বলেছেন তিনি। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কমিশন সন্তুষ্ট কি না জানতে চাইলে আবদুল মোবারক বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর মেহেরবানি। যথাযথভাবে নির্বাচন হয়েছে।’

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীর বিপুল বিজয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে জামায়াতিরা জেতে কিভাবে?

পাঠক বুঝে দেখুন, পত্রপত্রিকায় লেখা বিস্তর অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী দ্বিধাহীন। এ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তাহলে পঞ্চম পর্বে তা থেকে ব্যতিক্রম হবে কি?

লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য
(কালের কন্ঠ, ৩১/০৩/২০১৪)

You Might Also Like