সরকার ও নির্বাচন কমিশনের `আলহামদুলিল্লাহ’ নির্বাচন!

চতুর্থ দফার উপজেলা নির্বাচন হয়ে গেলো। এ পর্যায়ে কিছুটা মূল্যায়ন আবশ্যক হয়ে পড়েছে। প্রখম দফার নির্বাচন শেষ করেই সিইসি কাজী রকিবুদ্দিন সাহেব অবসরে গেলেন (এইচ টি ইমামের ভাষায়), এরপর থেকে নির্বাচন চালাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত সিইসি আবদুল মোবারক। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নীতি-নৈতিকতাবিহীন অসৎ যে কয়জন বুরোক্র্যাট আছেন, সে তালিকায় মোবারক সাহেব প্রথম কাতারে পড়বে। কাজেই, তাকে নিয়ে আর বলার কিছু নাই।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে সরকারী দল পিছিয়ে ছিল। ১৯ দলীয় জোট অনেক বেশী জিতেছিল, যদিও প্রথম দু’পর্বেও ব্যাপক কাপরচুপি করে সরকারী দল। আমার নিজের উপজেলায় অন্তত ত্রিশ হাজার ভোট কেটে নিয়েছিল সরকারী দল কোনো প্রকার মারামারি ছাড়াই। প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ যথারীতি সরকারী নির্দেশ পালন করে কেন্দ্র তুলে দিয়েছিল সিল মারার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারী দলের মস্তান গুন্ডাদের হাতে।

প্রথম দু’দফার নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে পুজি করে সরকারী দল কারচুপির ধরন ও কৌশল পাল্টায়। ভাটি অঞ্চলে বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় খুব সহজেই ফলাফল তৈরী করার মত ব্যালট সিল দিতে সমর্থ হয় সরকারী দল। কোথাও কোথাও বিরোধী প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দিয়ে ভোট কেন্দ্র ভোটারদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়, আধা ঘন্টা ভোট কাটা শেষ করা হয়। কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট হলেও ভোটের ব্যবধানের কারনে হয়ত বিরোধী দলের প্রার্থীরা বিজয় পায়। ফেনীর দাগনভুইয়া উপজেলায় নির্বাচনী পর্যবেক্ষকে গুম করে আওয়ামীগের পান্ডারা। ফেনীর দাগনভুঞা, চৌদ্দগ্রাম, লাঙ্গলকোট, কচুয়া, ভোলা সদর, বাগেরহাট সদর, শরীয়তপুর সদর, বরিশালের বাবুগঞ্জ, মুলাদী উপজেলায় আ’লীগের ভোট যেখানে এক/দেড় লাখ সেখানে বিরোধী দলের ভোট ৫/১০ হাজার। উল্লেখ করা যায়, ভোলা সদরে আওয়ামী লীগর ভোট ১,৫৬,৩৮৭/ বিএনপি মাত্র ৯৯০৪, ভোলার চরফ্যাশনে আওয়ামীলীগ ১ লাখ ৪৭ হাজার/ বিএনপি ১৩ হাজার ভোট, নাঙ্গলকোটে আওয়ামী লীগ ১,৩৭,০৫০ ভোট/ বিএনপি ২৩ হাজার ১৯২ ভোট, শরীয়তপুর সদরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৫২ হাজার/ বিএনপি প্রার্থী ১০ হাজার, শিবচরে আওয়ামীলীগ ১৩৪৮৮৬/ বিএনপি ১৫০৩৪ ভোট, কবিরহাটে আওয়ামীলীগ ৬৩ হাজার/ বিএনপি মাত্র ৪৪৪১, কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামীলীগ ৭৫ হাজার/ বিএনপি ১৪ হাজার, মুলাদীতে আওয়ামীলীগ ৭৬ হাজার/ বিএনপি ৫৭০৮ ভোট, চৌদ্দগ্রামে আ’লীগ ১ লাখ ২৭ হাজার/ বিএনপি ২৫ হাজার, কচুয়ায় আওয়ামীলীগ ৭৩,৬৬৫/ বিএনপি ২০,২৬৪ ভোট, বিএনপির ঘাটি ফুলগাজীতে আ’লীগ ৩১ হাজার/ বিএনপি ১ হাজার, সোনাগাজীতে আ’লীগ ১ লাখ ৬৫ হাজার ভোট/ বিএনপি প্রার্থী ৮ হাজার। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে এসব এলাকায় সঠিক ভোট হলে ফলাফল হতো উল্টো।

চতুর্থ দফা নির্বাচনের আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া, মেহেরপুর, জীবননগর উপজেলায় আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা ভোটারদের পিটিয়ে মারাসহ আঙ্গুল কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু ইলেকশন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আগের দিন বলা হলো সেনাবাহিনীকে গ্রেফতার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, ভোট কেন্দ্র দখল করলেই গুলি, নানাবিধ গল্প শোনা গেছে। কিন্তু ঘটনার সময় বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। নির্বাচনের দিন ৫ শতাধিক ভোট কেন্দ্র দখল করে নেয় সরকারী দল, বরুরায় আগের রাতেই ভোটবাক্স পূর্ন করে আওয়ামীলীগের প্রার্থী, আগৈলঝড়ায় সেনাবাহিনী পৌছার আগেই ৯টার মধ্যে ভোট শেষ, একই পদ্ধতিতে কমপক্ষে ২৫ উপজেলায় সবভোট কেন্দ্র দখল করে নেয় সরকারী দল, অন্যান্য উপজেলায় ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্র দখল করে ফলাফল কব্জা করার কালে ১ চেয়ারম্যান সহ ৪ জন নিহত হবার পরেও সরকারের আস্থাভাজন মোবারক বলেন- ”আলহামদুলিল্লাহ!” তিনি অবশ্য সরকারের প্রতি তার অনুগত্য যথাযথ ভাবে প্রদর্শন করথে সফল হয়েছেন। সরকারী দলের মুখপাত্রও নির্বাচন কমিশনের ভাষায়ই কথা বলছেন !

মূলত ৫ জানুয়ারী ভোটারবিহিন জাতীয় নির্বাচন থেকেই নির্বাচনের এই বড় ধস শুরু। সারা পৃথিবী থেকে সে নির্বাচন গ্রহনযোগ্যতা পায়নি, অথচ সরকার গঠন হয়ে গেছে। নির্বাচন পরবর্তী প্রতিবাদ থামাতে দ্রুততার সাথে কৌশলী উপজেলা নির্বাচন দেয় সরকার। ৫ দফায় ২ মাসব্যাপী নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে গিয়ে প্রথম চোটেই হোচট খায় সরকার। সরকারী দলের প্রভাব খাটানোর পরেও এগিয়ে যায় বিএনপি ও জামায়াত। প্রমাদ গুণে সরকার। তবে কি বিশ্ববাসী দেখে ফেলল জনপ্রিয়তাহীন সরকারের আসল রূপ? শুরু হয় আরো শক্তি প্রয়োগের খেলা। একেক দফায় বাড়তে থাকে নব নব কায়দায় ভোট কেন্দ্র দখল, ফলাফল উল্টানো এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দানের সরকারী তৎপরতা। এ যেনো এক মিথ্যাকে ঢাকতে শত শত মিথ্যার তৈরী করার মরন খেলা! তবে এ উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভোট সংস্কৃতিাট চিরতবে হারিয়ে গেলো। আর কখনো তা ফেরত আসবে কিনা বলা কঠিন।

বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সর্বত্রই নির্বাচনে কিছু অনিয়ম ও সংঘাত হয়ে থাকে। তবে সেটার মাত্র নগন্য হলে নির্বাচন গ্রহনযোগতা পায়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে যে ভোট কালচার চলছে, তাতে ভোট নয় বরং পেশী ও সরকারী ক্ষমতা খাটানোই যেনো নির্বাচনের মূল তরিকা। এ খুবই বিপজ্জনক পদ্ধতি, যেখানে সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যাকে বিজয়ী করা হয়। সেখানে আজ যারা সরকারী দলের সমর্থক, তারা হয়ত খুশি, কিন্তু এমন দিন কখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রকৃতির নিয়মেই অতি বাড়াবাড়ির দুর্গ ভেঙ্গে পড়ে, তখন আজকে যারা এর জন্য দায়ী বা খুশি তাদের কাঁদতে হবে অনেক বেশী। এদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতির ভবিষ্যত বড় অন্ধকার। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে রাজনীতিবিদরা। সামরিক বেসামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা আজকাল অনেক শিক্ষিত ও জ্ঞানী! তাদেরকে বলব আরেকটু খোঁজ নিন- রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যখন শিক্ষিত লোকেরা ইচ্ছা করে ধংস করে তখন সে জাতিকে কি ধরনের খেসারত দেয়! যে যত বড়ই ক্ষমতাশালী আর অর্থশালী হোন না কেনো, অবধারিত ধংসের হাত থেকে কারো রেহাই নেই। কারন প্রলয় এলে দেবালয় এড়ায় না।

You Might Also Like