কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি!

এক
লেখাটি চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির জন্য তৈরি করেছিলাম, যদি সেদিনই বেরুতো ভাল লাগতো। কিন্তু পাঠাতে পারি নি। আজ পাঠাচ্ছি। অতএব কাল ১৬ ফেব্রুয়ারিতে বেরুবে। তবে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতার পরে তরুণদের সবচেয়ে গৌরবের দিন। কিন্তু এই নানান কারণে ম্লান হয়ে গিয়েছে। সময় এসেছে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণদের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের এই কালপর্বটার ইতিহাস ধরে রাখার ও তার তাৎপর্য বিচারের। এর ব্যর্থতা ও সাফল্যের একটা খতিয়ান টানা দরকার। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে গণ অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা পুরা মাত্রায় হাজির ছিল।তরুণ নেতৃত্বের বিপ্লবী অংশের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এর সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও কৃষক সংগঠনগুলোর মোর্চাকে একত্র করা যায় নি। এটা সম্ভব হোত যদি বামপন্থিদলগুলো এই একত্রীকরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও কৌশলগত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারত। বামপন্থার ভাষায় যাকে সাধারণত রণকৌশল বলা হয়। সেখানে সঠিক পদপে ও বিচ্যুতিগুলো বিচার করবার একটা কর্তব্য এখনও রয়ে গিয়েছে। জনগণের আশা আকাক্সা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের রণনীতি যদি গণতন্ত্র কায়েম হয়ে থাকে তাহলে তা বাস্তবায়ন করবার কৌশল নিয়ে ভাবনা চিন্তা তর্কবিতর্কের কোন সুস্থ ও সচেতন ধারা বাংলাদেশে গড়ে ওঠে নি।কিন্তু বড় দলগুলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলোর আন্দোলনকে কাছাকাছি করবার চেষ্টার বিপদ ঠিকই উপলব্ধি করেছিল। দ্রুত তারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের কব্জায় নিতে যারপরনাই কোশেশ শুরু করে এবং সফলও হয়। অনেকে তখন বলেছিলেন বামদলগুলো ছিল ছোট ও দুর্বল। অতএব ছাত্র আন্দোলন বড় দলগুলোর অধীনে চলে যাওয়াটা ছিল অনিবার্য। এটা ঠিক নয়। কারণ দল হিসাবে বাম দল তখন দুর্বল হলেও বামপন্থী ছাত্র দলগুলো ছিল মূলত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান প্রাণশক্তি। এই েেত্র বামপন্থী নেতৃত্বের ব্যর্থতাই ছিল প্রকট। আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি আন্দোলনের হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে তার দুর্দশা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তার একটি জ্বলজ্বলে উদাহরণ। এর জন্য কে দায়ী আর কে দায়ী নয় সেই দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে না। বরং এই সময়ের বিচার হওয়া উচিত ব্যক্তিকে দোষারোপ মন্দ অভ্যাস পরিহার করে আসলে আন্দোলনের মর্ম ও তা পরিচালনার দূরদৃষ্টি বাম আন্দোলনের মধ্যে কতটুকু ছিল তা খতিয়ে দেখা। সেখানে অবশ্যই ঘাটতি ছিল। কিন্তু সেটা দোষের নয়। সে ঘাটতি কি বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতি কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? এটাই মূল কথা। বোঝা দরকার কিভাবে সেই সময়ের ‘তরুণ প্রজন্ম’ একটি অসাধারণ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু তার ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম যে আন্দোলন শুরু করেছিল এক দিক থেকে তার মর্যাদা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সমান গুরুত্বের। তবে আন্দোলনের মর্ম ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে দুটো আন্দোলনের তাৎপর্য আলাদা। বায়ান্নর আন্দোলন ভাষা ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও আত্মপরিচয়কে প্রবল করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্মের শুরু এখান থেকে। যার পরিণতি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতায়। তুলনায় চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির ডাক ছিল গণতন্ত্রের। ল্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে আভ্যন্তরীণ গঠনের দিক থেকে গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলা। শেষের ল্য পূরণ হয় নি। তার নানান কারণের মধ্যে একটি কারণ যাকে আমি প্রধান কারণ বলে মনে করি ওপরে উল্লেখ করেছি। অনেককে বলতে শুনি সবচেয়ে বড় বা প্রধান কারণ তিরাশির ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের কারও কারও রাজনৈতিক আপস অথবা অমতা। এটা একটি কারণ হতে পারে। অবশ্যই। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের নৈতিক স্খলন বা অমতার চেয়েও সামগ্রিকভাবে সমাজে আমরা বিভিন্ন বিষয় মীমাংসা করতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছি সে আলোচনাই এখন বেশি দরকার। ব্যক্তি যখন সমাজে আপস বা সমঝোতা করে সেটা রাজনৈতিক বা আদর্শগত স্খলনের কারণে ঘটতে পারে, কিন্তু কোন্ আদর্শ আমরা কে কিভাবে বুঝি সেখানে সুস্থ তর্কবিতর্কের ঐতিহ্যই গড়ে ওঠে নি, ঐক্য দূরের কথা। শব্দগত ব্যবহারের ফানুস ও ফাঁকা বকোয়াজগিরি ছাড়া। ফলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের রণনীতি ও রণকৌশলের েেত্র সমাজে অপরিচ্ছনতা থেকে গিয়েছে। এই অপরিচ্ছন্নতার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার েেত্র ভুল করা ব্যক্তির দোষ নাও হতে পারে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হবার পরে দশ দফার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে দ্রুত আন্দোলন সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায্যতা পায়। তখন আন্দোলনের চরিত্র ও পদ্ধতি নিয়ে একটা তর্ক শুরু হয়। শুরুতে আন্দোলনের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দুই একটি ছোট সংগঠন ছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো মূলত রাজনৈতিক দলেরই সম্প্রসারণ ছিল। তবুও ছাত্র নেতারা স্বাধীনভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাবার পপাতী ছিলেন, ঠিক যে বড় দলগুলোর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু অচিরেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে তাদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে সম হয়। বামপন্থী তরুণ বিপ্লবীদের নেতৃত্ব বিকাশের সমূহ সম্ভাবনাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্দোলনের চাবিকাঠি ছিল মূলত তাদেরই হাতে। আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে উঠল তখন বড় দলগুলো দেখল আন্দোলন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর বিপদ না বোঝার মতো বোকা তারা ছিল না। তারা তাদের ছাত্র সংগঠনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করবার চেষ্টা চালাতে লাগল। এর কুফল আন্দোলনের মধ্যেও এসে পড়ল। কিন্তু ছাত্র নেতারা আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন এটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। আন্দোলন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশ দফা পরিণত হয় এক দফার দাবিতে। বড় দলগুলো স্লোগান দেওয়া শুরু করে, ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’। এরশাদ গিয়ে খালেদা এলেন, হাসিনা এলেন, মাঝখানে ফখরুদ্দীনরাও এলেন গেলেন। কিন্তু ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’র কী হোল? এরশাদ কি আসলে গিয়েছেন? যায় নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহাল তবিয়তেই আছেন। তুলনায় বাম দলের নেতাদের দেখুন। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে স্বাধীনভাবে বিকশিত করা গেলে নগদ লাভ ছিল বামপন্থীদের। এটা বড় দল এবং তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো পরিষ্কারই বুঝত। আন্দোলন যত বেশী ছাত্রদের নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে থাকল তত বেশী তার প্রতি শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলো সংহতি বোধ করতে শুরু করল। জানালোও তারা। বাম ঘেঁষা ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলনের শ্রেণি চরিত্রে গুণগত পরিবর্তন আনবার জন্য এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করল। তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল। যতদূর মনে আছে, আন্দোলনের শুরুর দিকে ছাত্ররা দশ দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে। গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের মর্ম নির্ধারণের েেত্র প্রথম দশ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে ভূমিকা রাখে। কিন্তু বড় দলগুলো তা পুরাপুরি গ্রহণ করে নি। পরে দশ দফার পরিবর্তন আনা হয়। বড় দলগুলো শুরুর দিকে অমনোযোগী থাকলেও ক্রমে ক্রমে তারা এর ওপর প্রভাব খাটাতে শুরু করে। দফা ভিত্তিক আন্দোলন থেকে সরিয়ে তারা একে ‘এক দফা’ দাবিতে পরিণত করে। আন্দোলনের ল্য হয়ে দাঁড়ায় এরশাদকে সরিয়ে দেওয়া এবং বড় দলগুলোর মতায় যাবার ব্যবস্থা করা। ‘এক দফা’ দাবিই শেষতক বহাল থাকে। সংবিধান বদল করা হয় এবং এরশাদ সরে দাঁড়ান। সংবিধান ও রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি রেখে ‘ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা’র ভিত্তিতে মতার হাত বদল হয় মাত্র। গণ অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিয়ে সমাজের মতাবান শ্রেণি রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রকাঠামোর চরিত্র অুণœ রেখে শুধু এরশাদকে সরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হয়। এই েেত্র বড় দলগুলোর পরম সহযোগী হিসাবে বাম দলগুলো কাজ করে, এবং তাদের ঐতিহাসিক বিলয়ের রাস্তাঘাট তারা নিজের হাতে নিজেরাই তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর কেয়ার টেকার সরকারের ধারণা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের গোড়া যে তর্কে এসে ক্রমাগত এখন খাবি খাচ্ছে।

এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বহু প্রাণ অমর হয়ে আছে। শহীদ জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, আয়ুবসহ আরো অনেক। অনেকের নাম এখনও অজানা রয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এইভাবে সর্বদাই অলিখিত থেকে যায়। আরো রয়েছে সেলিম, দেলোয়ার ও বসুনিয়ার নাম। আমাদের ভোঁতা ইতিহাস বোধ বারবার আমাদের অন্ধকারে নিপে করে।
গণ আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রকাঠামো যা আছে তেমনি বহাল রেখে শুধু শাসক পরিবর্তন বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে ফারাক আসমান জমিন। সরকার আর রাষ্ট্র এক কথা নয়। রাষ্ট্র যদি সমরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী হয় তাহলে তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর গণ অভ্যুত্থান ছাড়া অসম্ভব। সেই েেত্র গণ আন্দোলন বা গণ অভ্যুত্থানে যারা জনগণকে নেতৃত্ব দেয় তারাই জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছা আকাক্সার গণতান্ত্রিক প্রতিনিধি হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ধ্রুপদী মডেল। বিজয়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে একটি সংবিধান সভা বা রাষ্ট্র গঠন সভা আহ্বান এবং তার জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। রাষ্ট্র গঠন সভার নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একটি গণতান্ত্রিক ‘গঠনতন্ত্র’ (Constitution) প্রণয়ন করে এবং গঠনতন্ত্র প্রণয়নের পরপরই নিজেদের বিলুপ্ত করে। এরপর নতুন সংবিধান অনুযায়ী নতুন জাতীয় সংদের নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় ভিন্ন হতে পারে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গণ ভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনষ্ট করা হয়েছিল। ফলে, এরশাদ আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামনের সারিতে হাজির রয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের বাস্তবতা মনে রাখলে আমরা বুঝব, তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে নি।
মূল প্রশ্ন অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের বহাল তবিয়তে থাকার নয়। বরং বড় দলগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপান্তর দূরের কথা, তাকে আরো অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট চরিত্র দান করেছে। অতএব দোষ শুধু একা এরশাদকে দিলে হবে না। এর জন্য সকলেই দায়ী। একজনকে একা দোষী বানিয়ে আমরা যার যার ভূমিকা থেকে খালাস পাবার চেষ্টা করতে পারি বটে, তবে ইতিহাস এত সহজে কাউকে ছাড় দেয় না।

তবে এখন বিপজ্জনক মনে হয় আমাদের স্মৃতি বিনষ্ট করবার প্রক্রিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলন, তার ফলাফল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে একটা নিরপে ও নির্মোহ পর্যালোচনার দরকার আছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে গৌরবের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারিকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে নীরব চক্রান্ত চলছে সেটাই ভীতির। এটা কিভাবে সম্ভব হোল? এটাই আমামদের সবার আন্তরিক প্রশ্ন হওয়া উচিত। এই সময়ের ইতিহাস আবার জাগ্রত করা খুবই জরুরী।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অনেকেই জড়িত ছিলেন, আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের রক্তয়ী লড়াইয়ের সূচনা দিনটি অসাধারণ তাৎপর্য নিয়েই হাজির হয়। সে সময় তারুণ্যের অর্থ ছিল সামরিক শক্তি আর স্বৈরশাসনের সামনে মাথা নত না করবার দিন। সশস্ত্রতা ও মৃত্যু উপো ও তুচ্ছ করবার দিবস। মৃত্যু মুখে তুড়ি দিয়ে প্রাণের জয়গান গাইবার দুঃসাহস। গৌরবের এই ইতিহাস আজ নানা কারণে ম্লান। এই গৌরবের ইতিহাস তরুণদের স্মৃতি থেকে মুছে দেবার কারবার চলছে পরিকল্পিতভাবে।

দুই
কবি হিসাবে এই সময় অনেকের জন্যই অসাধারণ স্মৃতি। এই লড়াই সংগ্রামকে ভেতর থেকে কবিরা দেখেছেন। অংশগ্রহণ করেছেন। লিখেছেন। এই সময় ‘লিপ্ত কবিতার ধারা’ হিসাবে কবিদের একটি আন্দোলন শুরু হয়। যার সরল অর্থ হচ্ছে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে কবি স্বয়ং যেমন লিপ্ত থাকে, তেমনি কবিতাও লিপ্ত হয়ে পড়ে। যে কবির এই সংবেদনা নাই, তাদের নাম হয়ে গিয়েছিল, ‘ভেজিটেবল’। বাইরের কোন দায় বা ইতিহাস বানাবার অহংকারে নয়, কবিতার নিজের গরজেই এই সংবেদনা, নইলে কবিতা বাঁচে না।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব আন্দোলনের এই ইতিহাস মুছে ফেলা এবং তার ব্যর্থতা দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিকারের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক দিক থেকে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম হবার শর্ত দ্রুত পূরণ হতে শুরু করে। শিল্প সাহিত্যের দিক থেকে ভেজিটেবল যুগের শুরুও এরপর থেকেই। তবে কবিতা ফুলকপির বাজার হয়ে গিয়েছে বলা অন্যায়, কারণ প্রতিভাবান আছেন অনেকেই। তবে সামাজিক, রাজনৈতিক বা দার্শনিক বিষয়ে কবিদের অনাগ্রহ চিন্তার উদ্রেক করে বৈকি। কবি বা কবিতাকে সরাসরি রাজনীতি করতে হবে এটা আমার দাবি না। কিন্তু কবিতা যখন সমাজের সম্পত্তি হয়ে পাঠকের দরবারে হাজির হয়ে তখন তার মাথায় ঘোমটা থাকে না। রাজনীতি লুকাবার কোন অবগুণ্ঠন কবিতার জন্য আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়েছে কি না আমার জানা নাই।

কবিতা তারস্বরে রাজনীতি করে না। বক্তব্য দিয়ে কবিতার বিচারও কবিতার মানদণ্ড নয়। কিন্তু সময় কবিতার আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে নিজেকে জানান দিয়ে যায়। যদি আঙ্গিক নিয়ে পরীা নিরীার কথা বলি তাহলে বলা যায় তথাকথিত প্রমিত বা ভদ্রলোকের ভাষাকে ভেঙে চুরে যারা ঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন সম্ভবত তাঁরাই এই সময়কে কবিতার জায়গা থেকে তুলে ধরেছেন। এবং ধরে রেখেছেন। এই ধরনের ভাষার ভাঙন ও কবিতা নিয়ে পরীা-নিরীার প্রতি আমার পপাতের কথা অনেক লেখায় উল্লেখ করেছি।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা কবিতা লিখে ইশতেহারের মতো বিতরণ করেছি। এরশাদবিরোধী সংগ্রামে পদ্য কোন ভূমিকা পালন করেছিল কি না জানি না। তবে ট্রাকের চাকায় তলায় পিষে এরশাদের ট্রাক যখন সেলিম ও দেলোয়ারকে হত্যা করল তখন সেই খবরে ক্রুদ্ধ হয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম, অনেকেরই তা মনে থাকতে পারে : লেফটেনান্ট জেনারেল ট্রাক।
লিখেছিলাম :

হে সামরিক পোশাক পরিহিত শাহানশার মতো ট্রাক
এই মিছিল
তোমার মতো বহুত শাহানশা’কে উলঙ্গ করে ছেড়েছে
তারপর প্রস্রাব করতে করতে
প্রস্রাব করতে করতে
প্রস্রাব করতে করতে
সামরিক আইন প্রশাসকের দফতরগুলো
পরিণত হয়েছে মিউনিসিপ্যালিটির
প্রস্রাবখানায়।

আজ নিজেকে প্রশ্ন করি, তাই কি? আমরা কোথা থেকে কোথায় এসেছি? কোথায় যাচ্ছি?
অনেক কবিতাই হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে এই দিনটি স্মরণ করা হোত। কাগজপত্র ঘেঁটে ১৯৮৭ সালের দুটো কবিতা খুঁজে পেলাম।
একটির নাম ‘এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে’। তখন মিছিলে দেখা মাত্রই গুলি করবার একটা নির্দেশ জারি হয়েছিল।
“বন্দুকের নলগুলো তারা তাক করেছে তোমার হৃদপিণ্ডের দিকে
তাজা রক্তের ওপর পিছলে যাচ্ছে সামরিক বুট
সারি সারি খাকি পোশাক যন্ত্রের মতো স্থির
নির্দেশের অপোয় এটেনশান
আজ এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে।
ধ্বংস ও হিংসার ভেতর একদা আমি রোপণ করেছি
নির্মাণের বীজ আর রূপান্তরের শিল্পকলা
সন্তানের মতো ইতিহাস তাকে গর্ভে ধারণ করেছে
পলিমাটির লজ্জাশীলা কাদাকে যেভাবে স্পর্শ করে অভিভূত চাষা
তোমার জননী ধরিত্রীকে আমি সেভাবে আলিঙ্গন করেছি
তারপর

ষোলবছর ধরে তোমাকে আমি লালন করেছি
ষোল বছর…
কিন্তু আজ এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে… ইত্যাদি।
কবিতাটি হাতে নিয়ে ভাবছি, দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ তো কার্যত এখনও বহাল আছে। নির্দেশ সামরিক শাসক নন, দিচ্ছেন নির্বাচিত সরকার।
আমরা কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি?

তাই স্মরণ করছি জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, আয়ুবসহ জ্ঞাত ও অজ্ঞাত সব শহিদদের। স্মরণ করছি সেই সময়ের তরুণ ছাত্র নেতাদের যারা তাদের দলের নিয়ন্ত্রণ উপো করে এবং মতাদর্শিক ভিন্নতাকে প্রধান গণ্য না করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলেন।
আন্দোলনের শুরুর দিকে সেটাও কম অর্জন ছিল না।
(নয়া দিগন্ত, ১৬/০২/২০১৪)

You Might Also Like