দেশটা কি একটা পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গেল!

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৮ নভেম্বর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল পুলিশের কাছে। পুলিশ সে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা ধরে তারা ডিএমপি অফিসে বসেছিলেন। ডিএমপির কেউ তাদের সঙ্গে দেখা করেননি, অনুমতি দেননি। কেন অনুমতি দেওয়া হলো না, এর কারণ দেখানোর তো প্রশ্নই আসছে নাÑ যেহেতু তারা দেখাই করেননি। একটি সূত্র আমাকে জানিয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার জন্য যে উদ্যান কর্তৃপক্ষ পিডব্লিউডির অনুমতি নিতে হয়, বিএনপি সেটিই নেয়নি। পুলিশ সূত্র সেটিই তাকে জানিয়েছে। সে যাই হোক, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের আগে-পরের ঘটনা এবং দিবসটির যাবতীয় বিষয় নিয়ে দেশে এখন রাজনৈতিক বিতর্কের অন্ত নেই। জিয়ার শাসনামল থেকে শুরু করে এরশাদের ৯ বছর এবং নব্বইয়ের পর বেগম জিয়ার ২ শাসনামলেই দিবসটি ছিল সরকারি ছুটির দিন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বিএনপি মনে করে, সিপাহি-জনতা স্বাধীনতার বীর সেনানী জেনারেল জিয়াকে এই দিনে মুক্ত করে নতুন করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মোচন করে। আবার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে এভাবেÑ ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর পুরো পরিস্থিতি এলোমেলো হয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানকারীরা একটি সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। বস্তুত ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো শাসন কর্তৃত্ব ছিল না। জেনারেল জিয়াকে বন্দি করে রাখা হয়। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও তাদের সহযোগী সৈনিকদের সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করে। সিপাহিরা সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে অভ্যুত্থান এবং জেনারেল জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। কিন্তু জিয়া এ বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। কর্নেল তাহের, জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এর প্রতিবাদ করে। এ কারণে জেনারেল জিয়া বিচারের নামে এক প্রহসনে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেন। ৭ নভেম্বর দিবসটি নিয়ে বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি আরও ভিন্ন। তারা মনে করে, ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত খালেদ মোশারফসহ বহু মুক্তিযোদ্ধার হত্যা দিবসটিকে কলঙ্কিত করে। তাই তারা ৭ নভেম্বর পালন করে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস হিসেবে। এ কারণেই ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিনে জড়িত পক্ষগুলো তাদের কথা বলবে, বর্তমানে তাদের মূল্যায়নকে জনসমক্ষে তুলে ধরবেÑ এটিই স্বাভাবিক।
বর্তমান সরকার গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর নির্বাচনী প্রহসনের পর জনগণের ভোটাধিকার রহিত করেই ক্ষান্ত হয়নি, ধীরে ধীরে জনগণের কণ্ঠ রোধ করার সব পদ্ধতি গ্রহণ করছে। এরই একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ঢাকা মহানগরে বিরোধী দলের সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভে খড়গহস্ত হচ্ছে তারা। ৮ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশের অনুমতি না দেওয়া ওই দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ। এ একই ঘটনা ঘটেছে গত ৩১ অক্টোবর আ স ম আব্দুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করেও। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুমতি চেয়ে তারা ব্যর্থ হন। আমি জেএসডির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা উদ্যানের জন্য পিডব্লিউডির অনুমতি নিয়েছিলেন। তারপরও ডিএমপি অনুমতি দেয় না দেখে বিরক্ত হয়ে প্রেসকাবে তাদের অনুষ্ঠান পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র ও মাঝারি গোছের দু’এক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহার করতে না দেওয়ার এক অদ্ভুত যুক্তি দেখালেন তারা। আমি যেদিন কথা বলছি, সেদিনই খবর এসেছেÑ পশ্চিমবঙ্গে দুইজন ও আসামে একজন জঙ্গি ধরা পড়েছে, যারা শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। তারা নিশ্চিত নন। কিন্তু বললেন, হতে পারে বেগম জিয়ার নিরাপত্তার কথা ভেবে পুলিশ এই অনুমতি দেয়নি। আমি বললাম, যেদিন থেকে বেগম জিয়া বিরোধী দলের নেত্রীর পদ হারালেন, সেদিন থেকেই তার সিকিউরিটি প্রত্যাহার করে নিয়ে তার জায়গায় আনসার বসিয়ে দিলেন। তার দল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হলো, এতে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি তৈরি হতে পারে। সে কথা কানেই তুললেন না। এখন আবার নিরাপত্তার কথা তুলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাতিল করছেন। ব্যাপারটি কি তাই! তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, নাটোর ইত্যাদি জায়গায় তাকে সভা করতে দেওয়া হলো কীভাবে। নিরাপত্তার প্রশ্নটি তো মফস্বলেই আরও প্রকট হয়ে ওঠার কথা ছিল।
আওয়ামী লীগের নেতারা আমার কথায় খুব বিরক্ত হলেন। আমি আর কথা বাড়াতে পারলাম না। আমার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা ছিল, এর মানে কি এই দাঁড়াচ্ছে না যে, রাজনৈতিক কর্মকা- চালানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর এখন পুলিশের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হবে। পুলিশ কি সেই সংগঠনÑ যারা রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমার এই লেখা পড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকগোষ্ঠী হয়তো মনে মনে ভাবছে, আমি বুঝি বিএনপির পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করছি। ভুল বোঝার কারণ নেই। আবার যদি কখনো এমন অবস্থায় হয়Ñ যখন বিএনপি ক্ষমতায় এবং আওয়ামী লীগ এই সভা-সমাবেশ করার অনুমতি নিয়েও পাবে না, তখন আবার আমি আওয়ামী লীগের পক্ষে বলব। কিন্তু এখন আমার নিজের কথা বলার জন্যও কলম ধরেছি।
আমি ১৫ নভেম্বর মিরপুরে আমার সংগঠন নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকে একটি গণসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। নাগরিক ঐক্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়। কিন্তু আমরা গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে কাজ করি। মনে করি, বাংলাদেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ ব্যাপারে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। ইতোমধ্যে উন্নয়নের সূচকে এক মাথাপিছু আয় ছাড়া প্রায় সব ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা মনে করি, যোগ্য নেতৃত্ব হলে নেতৃত্বের মধ্যে এই কুৎসিত ঝগড়াঝাটি-হানাহানি না থাকলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারতাম। এ জন্যই আমরা তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কথা বলছি।
মিরপুরে আমাদের এ গণসমাবেশে ড. কামাল হোসেনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সংগঠনের নেতাদের বক্তা হিসেবে অতিথি করেছি। আমরা চেয়েছি একটি প্রকাশ্য স্থানে জনসভার মতো করার। কিন্তু ৫ জানুয়ারির এই স্বনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এত ক্ষমতা যে, তাদের ভয়ে কেউ আমাদের মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিতে সাহস করেননি। অবশেষে আমরা একটি কমিউনিটি সেন্টারে ওই সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ডিএমপির কাছে আমরা এই সমাবেশে জনগণের শোনার স্বার্থে মাইক ব্যবহারের অনুমতি চাই।
২৮ নভেম্বর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি একটি অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চাই। এ জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে এ অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে নির্বাচন করেছি। উদ্যান কর্তৃপক্ষ এবং ডিএমপির কাছে আবেদনও জানিয়েছি। দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেখানে আমি বসে থাকতে চাই। আমার কর্মসূচি যারা সমর্থন করবেন, তারাও এসে বসতে পারেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মধ্যে এমন কিছুই হবে না- যাতে মহানগরের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে। আর আমি এমন কোনো মানুষ নই যে, আমাকে আঘাত করে কেউ নিরাপদ বোধ করবেন। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে কুৎসিত রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করবেন না। দেশের সাধারণ মানুষ হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে। এ জন্য পুলিশের অনুমতি নিতে হয়, তা ভাবলে ভালো লাগে না।
গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের যত দিক আছে, এর সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার নানা পরিকল্পনায় ব্যস্ত সরকার। জাতীয় সম্প্রচার নীতির মাধ্যমে প্রচারমাধ্যমের মুখে কুলুপ আঁটার ব্যবস্থা হচ্ছে। মধ্যরাতের জনপ্রিয় টিভি প্রোগ্রাম টক শোতে কে আসবেন, কে আসবেন না, কে কে কথা বলবেন, কে বলবেন না- এর হিসাব-নিকাশ চলছে। রাজধানীতে রাজনৈতিক সমাবেশ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যেমন খুশি তেমন করে অনুমতির পথ আগলে রাখছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। দেশটা কি একটা পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গেল!
লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য
উৎসঃ আমাদের সময়

You Might Also Like