‘সরকার স্বীকৃতি দিলেও, দেয়নি সমাজ’

মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার চান বাংলাদেশের হিজড়ারা৷ ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে সরকার স্বীকৃতি দিলেও সমাজ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, মেনে নেয়নি৷ এ কথা বলেন হিজড়াদের সংস্থা সুস্থ জীবনের নির্বাহী পরিচালক ববি হিজড়া৷
তিনি বলেন, ‘‘হিজড়ারাও তো মানুষ! তাদেরওতো সমাজের অন্য পাঁচজনের মতো বেঁচে থাকার অধিকার আছে৷ স্বাভাবিক চলাফেরার অধিকার আছে৷ অথচ রাষ্ট্রের কোথাও স্থান নেই আমাদের৷ পৃথিবীতে আপন বলে কেউ নেই৷ কেউ আমাদের ভালো চোখে দেখে না৷ ফলে প্রতিনিয়তই লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হচ্ছে৷ এবার সুযোগ চাই৷ আমরাও মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চাই৷ সম্মান চাই, অধিকার চাই৷”
হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গত ২ নভেম্বর থেকে সারাদেশে ‘হিজড়া প্রাইড কর্মসূচি ও পরামর্শক’ সভার আয়োজন করে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বিএসডাব্লিউএস)৷ সোমবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজিত এক পরামর্শক সভায় ‘ঢাকা ঘোষণা’র মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়েছে৷
বিএসডাব্লিউএস-র কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট জাহিদ আল আমিন বলেন, ‘‘ঢাকা ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে সরকারের স্বীকৃতির পাশাপাশি সাংবিধানিক স্বীকৃতি৷ সংসদে বিল এনে তা পাস করাতে হবে৷ তৃতীয় লিঙ্গের সাংবিধানিক স্বীকৃতি হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করবে৷ তখন হিজড়ারা সমাজে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে৷”
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত পরামর্শক সভায় উপস্থিত ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ কে এম নূর-উন-নবী, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, ইউএনএইডস এর কান্ট্রি ডিরেক্টর লিউ ক্যানি৷
তারানা হালিম বলেন, জাতীয় সংসদের একজন সদস্য হিসেবে তিনি দলীয় প্রধানসহ সবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন৷ সংসদে যাতে বিল পাস করা যায় তার ব্যবস্থা করবেন৷
হিজড়াদের সংগঠন ‘সম্পর্কের নয়া সেতু’র প্রেসিডেন্ট জয়া সিকদার বলেন, ‘‘সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলে অনেক কিছুই আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে৷ এখন কোনো বাড়ির মালিক বাসা ভাড়া দিতে চান না৷ সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই চাকরির সুযোগ নেই৷
সাংবিধানিক স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে এই সুযোগগুলোও পাওয়া যাবে৷” তিনি বলেন, হিজড়াদের এতদিন সম্পত্তির কোনো অধিকার ছিল না৷ এখন তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে সম্পত্তির ভাগ চান তারা৷ তাঁর মতে, শুধু কাগজে স্বীকৃতি দিলেই হবে না, রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে৷ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার৷ আর সে কাজ চাইলে রাষ্ট্রই করতে পারে৷
ববি হিজড়া বলেন, ‘‘অত্যাচার সইতে না পেরে দুইবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম৷ খেলতে গেলে না পুরুষ না নারী স্বভাবের কারণে ছেলে-মেয়ে কেউ খেলতে নিতো না৷ সবাই হাসিঠাট্টা করতো৷ বাড়িতে এসব বললে বাবা-মা-ভাই সবাই আমাকেই মারতেন৷ বলতেন, তোরই দোষ, আচরণ পাল্টাস না কেন? একদিকে বাড়িতে অন্যায়-অত্যাচার, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অন্যদিকে সমাজের তিরষ্কার চলতো প্রতিনিয়ত৷ এভাবে আর কতোদিন বাঁচা যায়!” তিনি বলেন, আমরা কাজ করে যেন দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি, সেই সুযোগ চাই৷
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত পরামর্শক সভায় উপস্থিত হিজড়ারা বলেন, ‘‘আমরা সমাজে মানুষের মতো বাঁচতে চাই৷ মানুষ হিসেবে প্রাপ্য অধিকার চাই৷ সুযোগ দিলে আমরাও সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারব৷ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আমাদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে৷ করুণা নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে আমরা কাজের সুযোগ চাই৷” তাঁরা বলেন, ‘‘হিজড়ারা চাঁদাবাজি করে বলে মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়৷ কিন্তু তাদের দুর্ভোগের কথা কেউ তুলে ধরে না৷”সূত্র:ডয়চে ভেলে।

You Might Also Like