এত দিন কীভাবে তিনি মন্ত্রী ছিলেন?

লতিফ সিদ্দিকী হজ ও তাবলিগ জামাতের ‘ঘোরতর বিরোধী’। ব্যক্তিজীবনে তিনি তা হয়তো হতে পারেন। কিন্তু তিনি এসব প্রকাশ্যে জানিয়েছেন এবং হজ পালনকারী ও তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়া মানুষের সমালোচনা করেছেন। এক দিন পর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর বক্তব্যের জন্য অনুতপ্ত নন বলে জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে আরও কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন।

লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছে দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় এবং আরও নানা সংগঠন। তাঁর সমালোচনা করছে আওয়ামী লীগও। হয়তো প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হতে হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ অবশ্য গতকাল জানিয়েছেন যে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু এটা যথেষ্ট হতে পারে না। কৃতকর্মের জন্য তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লতিফ সিদ্দিকী জেলে যাওয়ার মতো অপরাধ করেছেন এর আগে বহুবার। তিনি ৪৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিনা দরপত্রে, কখনো একক সিদ্ধান্তে, এমনকি কখনো বিনা মূল্যে তাঁর পছন্দনীয় ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তিনি নিজের হাতে সরকারি কর্মকর্তাকে পিটিয়েছেন। ছাত্রলীগের কর্মীদের হরতালকারীদের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের হত্যা করার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন। হাইকোর্টের প্রতি চরম অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এর প্রতিটি বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ দেশের সরকার, আইন-আদালত তাঁর সম্পর্কে নীরব থেকেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য এ দেশের বিভিন্ন আদালত মানুষকে চাকরিচ্যুতি থেকে শুরু করে সাত বছর কারাদণ্ড পর্যন্ত দিয়েছেন। লতিফ সিদ্দিকী বিভিন্ন সময় মহানবী (সা.), হাইকোর্ট, বিরোধী দলের নেতা-নেত্রী, সংখ্যালঘু মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চরম অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তাঁকে এ জন্য কোনো শাস্তি পেতে হয়নি।

যা ইচ্ছে করে, যা ইচ্ছে বলে লতিফ সিদ্দিকীর অন্য কোনো সমস্যাও হয়নি। তাঁর চেয়ে কম বিতর্কিত কিছু নেতা আওয়ামী লীগের এবারের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিসভায় বহাল থেকেছেন। আরও বেপরোয়া, আরও অশালীন এবং আরও উদ্ধত হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। ধর্ম, হজ এবং তাবলিগ জামায়াত নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠার পরও তাঁর কোনো অনুতাপ হয়নি। তিনি বরং তাঁর মন্তব্যে অনড় রয়েছেন বলে গত মঙ্গলবার দৃঢ়ভাবে বিবিসিকে জানিয়েছেন।

লতিফ সিদ্দিকীর মতে, এটি তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকীর জানা উচিত ছিল বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাই কেবল অবাধ অধিকার, সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবাধ নয়। হজ বা তাবলিগ জামাত বা ধর্ম নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে এটি অন্যদের কাছে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আট ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংবিধানের জন্মলগ্ন থেকেই রয়েছে। ধর্মপালন এবং ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তিনি যেসব অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, তা বরং বাংলাদেশের পেনাল কোডের ২৯৫-ক ধারা অনুসারে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তিযোগ্য একটি অপরাধ। ইসলাম বা অন্য যেকোনো ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে এ ধরনের গুরুতর অবমাননাকর মন্তব্য সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, মৌলবাদী শক্তিগুলোকে উসকে দেয় এবং বহু সাধারণ মানুষকে মর্মাহত করে। একজন মন্ত্রী এ ধরনের অপরাধমূলক মন্তব্য করলে সমাজে প্রতিক্রিয়া হয় আরও নেতিবাচক।

লতিফ সিদ্দিকীর আগের অপরাধগুলোও ছিল গুরুতর। তিনি হরতাল পালনকারীদের প্রকাশ্যে হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারি কর্মকর্তাকে পিটিয়েছেন। এ ধরনের একের পর এক ফৌজদারি অপরাধ করে লতিফ সিদ্দিকী পার পেতে পারেন না। অপরাধ করলে বিচার হয়, জেলে যেতে হয়। জেলে যাওয়া এড়ানো যায় কেবল অপরাধী মানসিক বিকারগ্রস্ত, এটি প্রমাণিত হলে। লতিফ সিদ্দিকী যদি তা-ই হন তাহলে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। যেভাবেই হোক, তাঁর কবল থেকে বাংলাদেশকে অবিলম্বে রেহাই দিতে হবে। উন্মত্ত, অশালীন, স্বেচ্ছাচারী, বিপজ্জনক একজন ব্যক্তি থেকে রেহাই পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের রয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে, এই প্রশ্নও এখন তোলা উচিত যে লতিফ সিদ্দিকীর মতো একজন ব্যক্তিকে মন্ত্রী বানানো হয়েছিল কেন? নানাভাবে সংবিধান লঙ্ঘন এবং ফৌজদারি অপরাধ করার পর তাঁকে এত দিন ধরে মন্ত্রী রাখা হয়েছেই বা কেন? লতিফ সিদ্দিকী বহু যুগ ধরে একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। তিনি বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে স্বয়ং সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদের পৈতৃক বাড়ি অবৈধভাবে দখল করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বাড়ি পুনরুদ্ধারে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল (দেখুন: রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক আনোয়ার উল আলমের রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা, পৃষ্ঠা ১০৬-১০৮। এমন একজন ব্যক্তি মন্ত্রী হলে জনস্বার্থ এবং সম্পদ নিরাপদ থাকে কীভাবে? চট্টগ্রাম সমিতিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং দাম নির্ধারণ না করে সরকারি জমি হস্তান্তর করার সময় নিজের হাতে এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি চট্টলা কন্যাকে বিয়ে করেছেন বলে লিখেছিলেন।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে তিনি রাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে কাজ করার যে শপথ নিয়েছিলেন, এ ধরনের ঘটনাগুলোতে তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছিল। তার পরও তাঁকে সরানো হয়নি কেন? কেন তাঁকে আবারও মন্ত্রী করা হয়েছিল ৫ জানুয়ারির পর?
লতিফ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, সেটিও অগ্রহণযোগ্য। জয় প্রধানমন্ত্রীর একজন ঘোষিত উপদেষ্টা, এটি তাঁর না জানার কথা নয়। জয় সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য আওয়ামী লীগের অনেককে ক্ষুব্ধ করতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাদের এটি মনে রাখা উচিত, ধর্মপালন নিয়ে লতিফ সিদ্দিকী যে মন্তব্যগুলো করেছেন, তা আরও অনেক গুরুতর। তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত মূলত এসব মন্তব্যের কারণে।
লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্য নিয়ে দেশ-বিদেশে তোলপাড়ে ধামাচাপা পড়ে গেছে সরকারের ঢালাও, আকস্মিক এবং উচ্চহারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগের সংবাদ। সরকার যদি লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এমন সন্দেহ বাড়বে যে এই ধামাচাপার প্রয়োজনেই লতিফ সিদ্দিকী চরম বিতর্কিত মন্তব্যগুলো করেছিলেন। এমন সন্দেহ সরকারের জন্য একসময় খুব খারাপ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, একমাত্র প্রধানমন্ত্রী বললে কেবল তিনি তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করবেন। আমার মনে হয় না বিবিসির সাক্ষাৎকারের পর এই মন্তব্য আর প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। এত কিছুর পরও লতিফ সিদ্দিকী পার পেয়ে গেলে সমাজে ক্ষমতাসীনদের উন্মত্ততা আর ঔদ্ধত্য আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
লতিফ সিদ্দিকীর তাই শুধু অপসারণ নয়, তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগের উপযুক্ত বিচার চাই।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

You Might Also Like