একটি টকশো এবং ছোট দলের রাজনীতি

আজকের কলামটি রাজনৈতিক দল নিয়ে। শনিবার ২০ সেপ্টেম্বর দিনের শেষে রাত ১২টার দু-এক মিনিট পরে অর্থাৎ রোববার ২১ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে, একুশে টিভির নিয়মিত টকশো ‘একুশের রাত’-এ উপস্থিত ছিলাম অন্য আরো দুইজনের সাথে তারা হলেন- সিপিবির উপদেষ্টা মঞ্জুুরুল আহসান খান, আমজনতার দল নামে একটি নতুন অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের আহ্বায়ক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক। উপস্থাপক যেই বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক ছোট দল আছে, তারা নিজেদের পরিচয়ে কতটুকুই বা দাঁড়াতে পারছে অথবা পারছে না। তারা কি বিভিন্ন জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বকীয়তা হারিয়ে, জোটের ভেতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে? তারা কি রাজনীতির অঙ্গনে কোনো প্রভাব রাখতে পারছে? যে তিনটি দলের নাম নিলাম এর মধ্যে সিপিবি অতীতে কোনো কোনো সময় জোটভুক্ত ছিল, এখন নেই। তবে ভবিষ্যতে যে জোটভুক্ত হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।

কিভাবে রাজনীতিতে জড়ালাম
১৯৯৬ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে আসার পর ১২ মাস এলপিআরে ছিলাম। এলপিআর শেষ হওয়ার পর, প্রত্যভাবে রাজনীতিতে জড়ানোর আগ পর্যন্ত একজন পর্যবেক বা সচেতন নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতাম। প্রত্যভাবে রাজনীতিতে জড়ানোর পরে রাজনৈতিক কর্মীর দৃষ্টিভঙ্গিতেও লিখি। শুধু কলাম নয়, স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশে যখন আসা শুরু করেছিল, তখন থেকেই চ্যানেলগুলোতে যাওয়া শুরু করি বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিতে। কলাম লেখা এবং টকশোর মাধ্যমেই আমার রাজনৈতিক চিন্তা- চেতনার বিকাশ ও উন্নতি ঘটতে থাকে। এরূপ করতে করতেই সিদ্ধান্ত নিই প্রত্যভাবে রাজনীতিতে জড়িত হবো। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০৭ সালের ৪ ডিসেম্বর। কল্যাণ পার্টি নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে।

সিপিবির নিবেদন
ওই টকশোতে প্রথম বক্তা ছিলেন সিপিবির উপদেষ্টা মঞ্জুরুল আহসান খান। তিনি জোটে থাকা বা না থাকার সুবিধা-অসুবিধা বর্ণনা করেন। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে দু’টি প্রধান জোট আছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বা এ মুহূর্তের সরকারি জোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। মঞ্জুরুল আহসান খান অনেকটা এ রকম (হুবহু নয়) বলেছেন, বাংলাদেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলÑ উভয়ই পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার প্রতীক এবং ওইরূপ সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনায় লালিতপালিত ও আবৃত। বৃহত্তর রাজনৈতিক আঙ্গিকে উভয় দল পুঁজিবাদী স্বার্থ রার তাগাদায় পরস্পরের সম্পূরক। গরিব মেহনতি মানুষের স্বার্থ রা করা এ দু’টি দলের পে সম্ভব নয়। তার মূল্যায়নে, আমাদের রাজনীতি বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ইংরেজি অর ‘এম’-এর পচনশীল প্রভাবে পড়েছে যথা মানি (অর্থাৎ কালো টাকা) মাসল (অর্থাৎ পেশিশক্তি, অস্ত্রশক্তি) এবং ম্যানিপুলেশন (অর্থাৎ জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, দখলদারি ইত্যাদি)। এই প্রোপটেই জনাব আহসান দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক বাম বিকল্প রাজনীতির একটি জোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে সিপিবির কোনো সাফল্য আছে কি না, এটা বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব খান অনেক রাজনৈতিক ঘটনা ও জনজীবনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন, যেগুলোর পরিপ্েেরিত সিপিবির আন্দোলন সফল হয়েছে বলে তার বিশ্বাস। বিদ্যুৎ ও বন্দর সম্পর্কিত আন্দোলন, কানসাট আন্দোলন, ফুলবাড়ী দিনাজপুর কয়লাখনি আন্দোলন, গার্মেন্ট অঙ্গনে অতি সাম্প্রতিক তোবা গ্র“পের আন্দোলন ইত্যাদি তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি একাধিকবার গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন, বাম দলগুলোর ঐক্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলা প্রয়োজন, এর জন্য চেষ্টা চলছে। তৃতীয় বক্তা ছিলেন প্রকৌশলী এনামুল হক।

মেজর জেনারেল ইবরাহিম ছিলেন দ্বিতীয় বক্তা। সে ‘একুশের রাত’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমি যা বলেছিলাম, সেগুলো এই কলামে হুবহু উদ্বৃত না করে, পরোভাবে না বলে প্রত্যভাবে নিজের বক্তব্য হিসেবে পুনরায় উপস্থাপন করছি। তাহলে আশা করি, বুঝতে সুবিধা হবে। বলা বাহুল্য, বলার ভঙ্গি এবং লিখিত ভঙ্গির মধ্যে একটু তফাত হবে।

মিডিয়া প্রসঙ্গ : ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড সাধারণত জনগণের সামনে আসে না; জনগণের দৃষ্টিতে পড়ে এমন কর্মকাণ্ড ছোট রাজনৈতিক দলগুলো কি করে, নাকি করে না? ছোট রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ছোট ছোট প্রোগ্রাম করে; কিন্তু সেগুলো যদি মিডিয়া কাভারেজ না পায়, তাহলে দেশবাসীর পে কোনো অবস্থাতেই জানা সম্ভব নয়। মিডিয়া কাভারেজ বলতে কয়েক বছর ধরে তিন প্রকারের কাভারেজ বলা যায়। যথাÑ টেলিভিশন, দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকা। এর মধ্যে টেলিভিশনই হলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং তাৎণিক প্রভাব বিস্তারকারী। অনলাইন পত্রিকা দেখে বা পড়ে এমন লোকের সংখ্যা সীমিত এবং এটা প্রধানত শিতি তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দৈনিক পত্রিকা কাভারেজ দিলেও ছোট দলগুলোর সংবাদ সাধারণত ভেতরের কোনো একটি পৃষ্ঠায় একটি কোনায় দেয়। তাহলে কি ছোট দলগুলো মিডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে? আমার উত্তর হলোÑ না, অভিযোগ করবে না। মিডিয়া তাদের কাটতি, দর্শকের চাহিদা এবং কোনো কোনোেে ত্র রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয় কোনো একটি ছোট দলের প্রোগ্রামটিকে কতটুকু কাভারেজ দেবে? আমি মনে করি, অন্য অনেক ছোট দলের তুলনায় বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি মিডিয়ার প থেকে বেশি ইতিবাচক সমর্থন পেয়েছে। এর জন্য এ চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রোগ্রামগুলোর উপযুক্ততা দু’টিই অবদান রেখেছে। পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব মিডিয়ার সাথে সুসম্পর্ক রাখেন। আরেকটি কথা আছে, কোনো একটি ছোট রাজনৈতিক দলকে যদি এমন কোনো বড় প্রোগ্রাম করতে হয় যেটি তাৎণিক মিডিয়ার দৃষ্টিতে আসবে, অনেক টিভি ক্যামেরার দৃষ্টিতে আসবে, তাহলে সেই প্রোগ্রামটির জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে, শ্রম দিতে হবে এবং কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ছোট দলগুলো সেই অর্থ কোথায় পাবে? তাই এখন অর্থের আলোচনায় আসি।

আর্থিক প্রসঙ্গ : আরো ১৫-২০টি ছোট দল কিভাবে চলে সেই ব্যাখ্যায় যাবো না; কিন্তু বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামে রাজনৈতিক দলটি একান্তভাবেই অতি মিতব্যয়িতার মাধ্যমে চলে, কষ্ট করে চলে। দলের চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ নেতারা মিলিতভাবেই বেশির ভাগ ব্যয় বহন করেন। কনিষ্ঠরা ও সাধারণ সদস্যরা সম্পৃক্ততা বজায় রাখেন নিয়মিত ুদ্রাতিুদ্র অনুদানের মাধ্যমে। মাঝে মধ্যে জ্যেষ্ঠগণের বন্ধুবান্ধব ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ছোট ছোট অনুদান দিয়ে সাহায্য করেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। কারণ, সরকার যদি তাকে প্রশ্ন করে ‘তুমি কেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে বা জেনারেল ইবরাহিমকে সাহায্য করেছ?’ তাহলে সেই সাহায্যকারী বিপদে পড়বেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রতিহিংসা। কল্যাণ পার্টিকে বৃহৎ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা বৃহৎ কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য করে না। সুধী পাঠক, মেহেরবানি করে নিজেই একটি প্রশ্ন করুন। তা হলো, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে কেন সাহায্য করবে? সাহায্যকারীর কী লাভ? তাহলে কথাটা এ রকম দাঁড়ায়, নিশ্চিতভাবে টাকা-পয়সার সোর্স না থাকলে একটি রাজনৈতিক দলের বড় কোনো প্রোগ্রাম করতে কষ্ট হয় এবং সার্বিকভাবে বিকশিত হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

রাজনৈতিক আদর্শ প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল বলতে দু-চারটির বেশি নেই। যথা কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সাম্যবাদী দল ইত্যাদি। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগেরও অবশ্যই রাজনৈতিক আদর্শ আছে, কিন্তু এর বাক্যবিন্যাস ও ব্যাখ্যা ব্যাপকভিত্তিক হওয়ায় তাদের আদর্শিক পরিচয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। উদাহরণস্বরূপ, জামায়াতে ইসলামী নামক রাজনৈতিক দলটি এমনভাবে আদর্শভিত্তিক যে, তাদের নেতাকর্মীরা আদর্শের জন্যই রাজনীতি করেন এবং ওই রাজনীতিকে তারা সর্বতোভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করেন। এই আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেসব ব্যবসায় বা শিল্পোদ্যোগ গ্রহণ করেন, সেখানকার উপার্জন থেকেই তারা কিছুটা আত্মত্যাগ বা স্বার্থ ত্যাগ করেন রাজনীতির খাতিরে। এটাই বাস্তবতা ও বাস্তবসম্মত বলে স্বীকার করি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি সমাজ তথা করপোরেট জগৎ প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলকে আর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে। দেশের দু’টি বড় দলের মধ্যে যেই বড় দলটিই মতায় থাকুক না কেন, তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা সহজ এবং বিনিময়ে দ্রুত পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটে। মাঝারিদেরেে ত্র সম্ভবত সাহায্য সহযোগিতা অতি প্রকাশ্যে না করলেও আধা প্রকাশ্যে বা আধা সঙ্গোপনে এইরূপ সাহায্য সহযোগিতা করা হয়। আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থা পুঁজিবাদী, সেহেতু এই সমাজব্যবস্থায় দেয়া-নেয়া, লেনদেন, দান-প্রতিদান, যোগ-বিয়োগ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ইত্যাদি প্রক্রিয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাজনৈতিক দলকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন, তারা আদর্শকে পছন্দ করেই করেন কিছুটা, আবার নগদ অথবা বাকিতে কিছু প্রাপ্তির আশাতেও করেন, এটাও সত্য; কিন্তু বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামে একটি নবীন বা ুদ্র রাজনৈতিক দল, আর্থিক সহযোগিতাকারীকে নগদ কোনো পুরস্কার আইনানুগ হলেও দিতে পারবে না, বাকিতে দেয়ারও নিশ্চয়তা নেই। কারণ, মতার অংশীদার হতে না পারলে বৈধ উপকারই বা কিভাবে করবে? অতএব, কোনো বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা শিল্পপতি এ দলকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার অবকাশ কম। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি প্রসঙ্গে যা বললাম, এ কথাটি বেশির ভাগ ছোট রাজনৈতিক দলের জন্য প্রযোজ্য। এই প্রোপটে ছোট দলগুলো কি রাজনীতি করা ছেড়ে দেবে? আমার উত্তর হলো, না। কারণ, যদি সমাজে এবং রাজনীতির অঙ্গনে কোনো কিছু উন্নতি করতে হয়, তাহলে এখন ধৈর্য ধরে কষ্ট করে টিকে থাকতেই হবে। অতঃপর মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায় এবং জাগতিক নিয়মে মানুষের সমর্থনে, যখন আইনানুগ সুযোগ পাওয়া যাবে তখন রাজনৈতিক ও সামাজিক দুষ্টতগুলোকে চিকিৎসা করতে হবে।

ছোট দলগুলোর আদর্শ : এই পর্যায়ে প্রশ্ন এসেই যায়, ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর কি কোনো ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ নেই? সবার কথা বলতে না পারলেও উদাহরণস্বরূপ ছোট দলগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির কথা বলি। আমি মনে করি, আমার মধ্যে চারটি চেতনা কাজ করে। যথাÑ আমি একই সাথে একজন মুসলমান, একজন বাঙালি, একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন বাংলাদেশী। মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায়ই আমি মুসলমান এবং বাঙালি। মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায়ই নিজের ইচ্ছায় আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সবার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র। তাহলে কোন চেতনাটিকে অবহেলা করা যাবে? মুসলমান হিসেবে আমার যে চেতনা তার সাথে আমার মৃত্যুপরবর্তী অন্তহীন জীবনের সম্পর্ক আছে। তাহলে চারটি চেতনার মধ্যে কোনোটিকেই অবহেলা করার নয়। মুসলমান যদি না হই, অন্য ধর্মের অনুসারী হই তাহলেও সেই ধর্মের চেতনা আমার মধ্যে থাকতেই হবে। আমি বা কল্যাণ পার্টির কেউই ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনাবিহীন রাজনৈতিক অস্তিত্ব স্বীকার করি না। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ নামক বিষয়টি এবং রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়া উচিত, জাতীয় বিভক্তির প্রতীক নয়। তাই কল্যাণ পার্টি সব জাতীয় নেতাকে যথা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যথোপযুক্তভাবে দিয়ে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে আগ্রহী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতিকে বিভক্ত না করে, ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলেই আমাদের সবার মঙ্গল। এ মুহূর্তে বাংলাদেশী প্রজন্ম, অর্থাৎ ১৯৭১ বা তার পরে জন্ম নেয়া মানুষের সংখ্যা, বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৬৫ ভাগের বেশি। বাকি ৩৫ ভাগের মধ্যে কতজন আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, হয়তো বা ১ শতাংশের অর্ধেক বা ১ শতাংশ। আমাদের মনোযোগ তাহলে ৬৫ ভাগের দিকেই যাওয়া উচিত, সাথে আরো ৩৪ ভাগের দিকে যাওয়া উচিত। আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। অর্থাৎ ধনী, গরিব, মেধাবী, অমেধাবী, প্রবীণ, তরুণ, শ্রমিক ও উদ্যোক্তা সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণেই রাজনীতির অঙ্গন সোচ্চার হওয়া উত্তম। কল্যাণ পার্টি মনে করে, রাজনীতির উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত, মানুষের কল্যাণ। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। পাশ্চাত্য বিশ্বে কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ আছে। তারা মুসলমান নয়। অথচ শুধু মুসলমানগণের জন্য নয়, বরং সৃষ্টিজগতের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মনোনীত নেতা হজরত মুহাম্মদ সা: নিজেই ছিলেন সার্বিক ও শাশ্বত কল্যাণের প্রতীক, কল্যাণের প্রতিভূ (রাহমাতাল্লিল আলামিন)। আমরা মুসলমানেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে জনকল্যাণের পরিবর্তে নিজের এবং গোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যস্ত থাকি। এটা অন্যায় এবং সেই সাথে বন্ধ করতেই হবে। কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। সচেতন সৎ কর্মী বাহিনী প্রয়োজন। দীর্ঘ সময়ও প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, এ জন্য অবশ্যই আর্থিক খরচও দরকার। বাংলাদেশে অনেকেই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন চান, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চান, কিন্তু তিনি নিজে শ্রম বা সময় দেয়া তো দূরের কথা, মেধা বা অর্থও দিতে প্রস্তুত নন। তাহলে কাজটা কিভাবে হবে? কিভাবে কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা যাবে? আমার দলের স্লোগান বা নীতিবাক্য হলো ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই। অর্থাৎ কালো টাকার প্রভাব, পেশিশক্তির প্রভাব, অসততার প্রভাব বন্ধ করতে হবে। মেধাবী লোকজনকে রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ করতে হবে। সৎ পরিশ্রমী মেধাবী মানুষকে অবদান রাখার জন্য সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের সচেতন মানুষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।

নেতৃত্ব : বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই। এই আন্দোলনে নেতৃত্বের ব্যাপকতা সৃষ্টি করতে হবে বা নেতৃত্বের ভিত্তিমূল বৃহৎ পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নেতৃত্বে কারা আসবেন? যিনিই আসুন না কেন, তাকে এতটুকু প্রমাণ রাখতে হবে বা এতটুকুর পরিচয় দিতে হবে যে, তিনি সৎ, আগ্রহী, পরিশ্রমী, মিশুক এবং সর্বশেষ তার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। আমি চেষ্টা করছি এই গুণাবলি আরো অর্জন করতে ও বিকশিত করতে। তখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যভাবে প্রবেশ করিনি। দৈনিক পত্রিকা যুগান্তরে শুক্রবার ৬ জুলাই ২০০৭ তারিখে আমার একটি নাতিদীর্ঘ সাাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। যুগান্তর সাাৎকারটির শিরোনাম দিয়েছিলÑ ‘আমরা যা পেয়েছি তা বিলিয়ে দিতে হবে’। অবশ্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্যাগী ব্যক্তি প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তায়ালা যেহেতু যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন, সচ্ছলতা দিয়েছেন, পারিবারিক সুখশান্তি দিয়েছেন, ভালোবাসার জন্য মুরব্বি ও কনিষ্ঠ উভয় দিক থেকে দান করেছেন, সেহেতু আমার কাছে প্রশ্নÑ আমি কি লোভী হয়ে, বৈষয়িক লাভের জন্য আরো সংগ্রাম করতেই থাকব? নাকি, মহান দয়ালুদাতা সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আমার সৌবাগ্য থেকে দান করতে থাকব? আমার উত্তর হলো, বিলিয়ে দিতে হবে। অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সাংগঠনিক শক্তি, স্নেহ-মায়া-মমতা সব কিছুই বিলিয়ে দিতে হবে। সেজন্যই রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেষ যে কথাটি বলব, সেটি হচ্ছেÑ মতায় গিয়ে স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করতে হবে।

অনুকরণ ও অনুসরণ : মালয়েশিয়ার ২২ বছরের প্রধানমন্ত্রী, আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ডা: মাহাথির মোহাম্মদ তার আত্মজীবনী লিখেছেন। দীর্ঘ বইটির নাম ‘এ ডক্টর ইন দি হাউজ’। নামটির বাংলা অনুবাদ করলে এ রকম দাঁড়ায়Ñ ‘বাড়িতে একজন চিকিৎসক’। বইয়ের মধ্যেই মাহাথির মোহাম্মদ ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেন, পঞ্চাশের বা ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকেও মালয়েশিয়া নামে দেশ ও সমাজকে একটি রোগী বিবেচনা করলে তার চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজন ছিল। তিনি রাজনৈতিক ডাক্তার। মাহাথির মোহাম্মদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ওই রাজনৈতিক ডাক্তারের ভূমিকা পালন করেছিল। তাই তিনি আত্মজীবনীর নাম দিয়েছেন বাড়িতে একজন চিকিৎসক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসুস্থতা নিরাময় করার জন্যও চিকিৎসক প্রয়োজন। অতি সাম্প্রতিককালে তুরস্কের প্রত্য ভোটে নবনির্বাচিত (এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী) এরদোগানও এ মুহূর্তে একজন অনুসরণীয় আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার ধ্যানধারণা আমার ১১তম বই ‘মিশ্র কথন’-এ ব্যাপকভাবে উল্লেখ করেছি। এ কলামের শেষে দেয়া ওয়েবসাইট ঘাঁটলেই এমএস ওয়ার্ড ভার্সনে, পুরো বইটি যেকোনো আগ্রহী পাঠক দেখতে পাবেন।

রাজনৈতিক জোট : ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব কাজের ম্যান্ডেট বা কর্তৃত্ব জনগণ সরকারকে দেয়নি সেই কাজগুলো তারা করেছেন, যেমন- সংবিধানের অযাচিত সংশোধন। এ ছাড়াও তাদের আমলে দুর্নীতি, দুঃশাসন এবং অপরাজনীতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রতিবাদে এবং এর প্রতিকারের জন্য অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সমমনা দলগুলোকে পাশে আসার ও থাকার আমন্ত্রণ জানায়। এভাবেই ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১১ সালের রমজান মাস শুরু হওয়ার তিন দিন আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান কার্যালয়ে অতিথি হয়ে এসেছিলেন এবং একসাথে পথচলার দাওয়াত দিয়েছিলেন। রোজার ঈদের ১০ দিন পর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে যে আলাপ হয়েছিল, এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। যা হোক, ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ দলীয় জোটের যাত্রা শুরু হয় যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে। ওই ঘোষণায় বা তার পরবর্তী কর্মকাণ্ডে বা আলোচনায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে ১৮ দলীয় জোটের প্রকৃতি ও ভূমিকা কী হতে পারে, সেটা স্পষ্ট করা হয়নি, যদিও করা হলে ভালো হতো; কিন্তু ১৮ দলীয় জোট, ছোট ছোট ভাঙাগড়ার মাধ্যমেই এখন ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি এবং আরো প্রায় ১০-১২টি ছোট রাজনৈতিক দল এই জোটের সদস্য। দু-চারটি মাঝারি রাজনৈতিক দলও সদস্য। প্রধান বা শক্তিশালী শরিক দল হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। ছোট দলগুলো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে চেষ্টা করে কেউ সফল হয়, কেউ হয় না। প্রক্রিয়াটি কঠিন নিঃসন্দেহে।

বিলীন নয়, একাত্ম : একুশের রাত টকশোতে উপস্থাপক প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি জেনারেল ইবরাহিম বা আপনার পার্টি কি স্বকীয়তা ত্যাগ করে বড় শরিকের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছেন না? উত্তরে বলেছিলাম, না। তবে আমার জন্মস্থান চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় ও সংলগ্ন নির্বাচনী এলাকায় (চট্টগ্রাম-৫), আমি জোটের সবাইকেই আমার নিজের মনে করি। জোটের সবাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের একজন মনে করে। ওই এলাকায় আমার পার্টির পরিচয়কে জনগণ গৌণ মনে করেন, বরং ২০ দলীয় জোটের প থেকে অন্যতম শীর্ষ নেতা জাতীয়ভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তি, দেশনেত্রীর আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম যে তাদেরই এলাকার সন্তান, এটাকেই বড় করে দেখেন। জোটকে সম্মান জানানোর জন্য, বিশেষ করে প্রধান শরিক বিএনপিকে সম্মান জানানোর জন্য বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে ওই এলাকায় অন্য দলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামাইনি।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

You Might Also Like