নয়া সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে কথা

ড. আবদুর রহমান সিদ্দিকী : আধুনিককালের বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট এম. ম্যাকাইভার তার বহুল পঠিত দি ওয়েব অব গবমেন্ট গ্রন্থে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, স্বৈরশাসকগণের প্রথম ও প্রধান টার্গেট হলো মিডিয়া, এরা স্বাধীন মিডিয়াকে ভয় পায়, আতঙ্কিত থাকে কখন কোন অপকর্ম, দুষ্কর্মের ইতিবৃত্ত না জানি ফাঁস হয়ে পড়ে। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে মিডিয়াকে মুঠোয় নেয়ার, কুক্ষিগত করার। স্বৈরশাসনকে অব্যাহত রাখতে কেড়ে নিতে হয় মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে, অস্বীকার করতে হয় জনগণের অবাধে কথা বলার অধিকারকে। তবেই একনায়কত্ব নিরঙ্কুশ হবে, নির্বিঘœ হবে স্বেচ্ছাচারী শাসন। সব স্বেচ্ছাচারী শাসকচক্রেরই একই বৈশিষ্ট্য, তারা অভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল তার জনপ্রিয় উপন্যাস ১৯৮৪ এ দেখিয়েছেন স্বৈরশাসকরা কীভাবে নজরদারি করে। শাসকগোষ্ঠীর এজেন্টরা, বিগব্রাদারেরা উৎকর্ণ থাকে কে কোথায় শাসকদের বিপক্ষে কিছু উচ্চারণ করে, দুঃশাসনের প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখায়। বিগব্রাদারদের নজরে পড়লে তার আর রক্ষা নাই।

আমাদের এই পলিমাটির ভূখণ্ডে যুগে যুগে এর ব্যতিক্রম হয় নাই। এদেশের মানুষ স্বাধীনতাপ্রিয়। তারা বাক স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে চেয়েছে চিরকাল। কিন্তু বারে বারে স্বৈরশাসকেরা লৌহ দণ্ড হাতে আলাপপ্রিয় জনগণকে খামোস করে দিতে চেষ্টা করেছে, মত প্রকাশের অধিকারকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছে। সম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকরা এদেশ দখল করে অনতিবিলম্বে চাপিয়ে দেয় তাদের কঠোর প্রকাশনা আইন, সাতপাকে বেঁধে ফেলে জনসাধারণের মতপ্রকাশের অধিকারকে। তারাই প্রথম প্রণয়ন করে প্রেস এন্ড পাবলিকেশন আইন। লেখালেখির উপর তারা করে নগ্ন হস্তক্ষেপ। উপনিবেশিক কঠোর শাসনের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলেও ঢেলে সাজানো হয় প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট। এই আইনের বলে বন্ধ হয়েছে অনেক পত্র-পত্রিকা, বাধাগ্রস্ত হয়েছে অনেক সংবাদপত্রের প্রকাশনা, কারাগারে যেতে হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও সংবাদকর্মীদের। দৈনিক ইত্তেফাকের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাদের একজন। পাকিস্তান আমলের এই কঠোরতাকে বিশষভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মেনে নিতে পারেন নি। তারা এই অবস্থার অবসান কামনা করেছেন। তারা প্রত্যাশা করেছেন অবাধ বাক স্বাধীনতা চর্চা করার মত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এহেন অধিকার হরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার অনুযোগ-অভিযোেগের পটভূমিতে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। নবউত্থিত এই জাতি আশায় বুক বাঁধে, তারা অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করবে, ফিরে পাবে সব হারানো অথবা না পাওয়া অধিকার-প্রতিষ্ঠিত হবে উদার গণতন্ত্র, থাকবে অভিমত প্রকাশের অবাধ অধিকার। কিন্তু অতি অল্পকালের মধ্যেই জনগণের স্বপ্ন ভঙ্গ হল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই যারা যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তারা মেজাজ মর্জি ও খেয়ালে অভিপ্রায়ে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী জামানার শাসকদের থেকে আলাদা কিছু ছিলেন না। এরাও আবির্ভূত হলেন এক নতুন চেহারায়। নতুন এ শাসক শ্রেণীও রাষ্ট্র ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে চায়। মুঠোর মধ্যে নিতে চাইলো পুরো রাষ্ট্র যন্ত্রকে, সকল ক্ষমতা, কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করতে হলো বদ্ধপরিকর। জনগণকে পরিণত করতে চাইল নির্বাক সেবাদাস শ্রেণীতে। আর নিজেরা ক্ষমতায় থাকতে চাইল চিরকাল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্যে করা হল নানা কারসাজি, পাতা হলো নতুন নতুন ফাঁদ। নতুন করে প্রণয়ন করা হলো প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট। দেশ স্বাধীন হবার দুই আড়াই বছরের মাথায় কেড়ে নেওয়া হলো জনগণের বাক স্বাধীনতা, হরণ করা হলো মিডিয়ার অবাধ বিচরণের অধিকারকে। এ নতুন আইনের দুটো ভয়ংকর দিক প্রকটিত হল। বন্ধ হলো ডজন ডজন প্রেস, সংবাদপত্র, বেকার হলো হাজার হাজার সংবাদকর্মী। তাদের অনেকেই ঠাঁই পেলেন কারান্তরালে যেমন আল মাহমুদ, ড.আফতাব আহমেদ প্রমুখ। বন্ধ হলো দৈনিক পত্রিকা গণকণ্ঠ, অতঃপর দৈনিক পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক হক কথা এমনি আরো অনেক। রেডিও বাংলাদেশকে পরিণত করা হলো একজনমাত্র ব্যক্তির অষ্টপ্রহর গুণকীর্তনের একটি বাক্সে। টিকে রইলো সরকারের অনুগৃহীত গুটিকয়েক সংবাদপত্র আর তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় একজন মাত্র নেতা, একটি দল তথা একটি গোষ্ঠীর স্তুতি স্তাবককারীদের সংস্থায়। সরকারের সমালোচনা করে তাদের ভুল-ভ্রান্তি ধরিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ রইলো না। রইলো না ভিন্নমত প্রকাশের কোনো অবকাশ। কণ্ঠ চেপে ধরা হলো সমুচিত বক্তাদের অথচ ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রথম আলামত। সেই আলামত নিশ্চিহ্ন করে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে বসেÑত্বরিত ফ্যাসিস্ট চেহারা ধারণ করে লিপ্ত হয় প্রতিবাদীদের স্তব্ধ ও প্রতিহত করার কাজে। শাসকদের আশ্রিত সংবাদপত্র কয়টির মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করা। তাদের স্বৈরাচারী শাসনকে সমর্থন দেয়া এক কথায় একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানো। এক নেতা, এক দল, এক দেশ এই ফ্যাসিস্ট স্লোগানকে দশদিকে ছড়িয়ে দেয়ার, এই কুখ্যাত মন্ত্রকে জনগণের কানে কানে, জাতির হৃদয়ের কন্দরে কন্দরে পৌঁছে দেয়া তাদের কর্তব্য কর্ম হয়ে পড়ে। বস্তুত একনায়কতান্ত্রিক শাসনকে চিরস্থায়ী করার এ ছিল- এক জঘন্য ষড়যন্ত্র। কুখ্যাত প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট (১৯৭৩) কে নিজেদের অন্যায় অর্থ বিত্ত অর্জন, প্রভাব প্রতিপত্তি জাহির এবং দেশব্যাপী খুনখারাবি, দুষ্কর্ম ও দুঃশাসনকে, প্রশাসনিক অথর্বতাকে জায়েজ করার কাজে লাগায়। এরা মিডিয়াকে বানায় পায়ের পয়জার। এভাবে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে একটি পরিবার/দলের সম্পত্তি। প্রশাসন নেয় নতুন লেবাস-নাম তার বাকশাল। আর বাকশাল হলো লেলিন স্টালিনের অনুসৃত রাজনৈতিক দর্শনের দেশীয় সংস্করণ-যেখানে গণতন্ত্রের কোনো ঠাঁই নেই। বাকশালের ছায়ায় বংশ পরম্পরায় একটি পরিবার ও তাদের অনুগত একটি চক্র মালিক মোক্তার বনে যেতে চাইলো এদেশের। জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এসব হচ্ছে ইতিহাসের সত্য। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজও রয়েছে তার সাক্ষী।

কিন্তু ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের এক অকল্পনীয় বিশাল ঢেউ এসব কিছু লন্ডভন্ড করে দেয়, অকস্মাৎ বদলে যায় দৃশ্যপট, জাতি শুরু করে নব অভিযাত্রা। নতুন করে প্রণীত হলো মানুষের অধিকার রক্ষার বিধিবিধান, সংস্কার সংশোধন করা হলো প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট। মিডিয়া লাভ করে স্বাধীনতা। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র পায় বৃহত্তর অধিকার। গণমানুষ ফিরে পায় তাদের বাকস্বাধীনতা, সাংবাদিকরা লাভ করে অবাধে লিখবার অধিকার। নতুন করে তৈরী হয় গণতন্ত্রের বাতাবরণ। শতদল ফুটে উঠবার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বইতে শুরু করে গণতন্ত্রের সুবাতাস। মানুষ ফিরে পায় অবাধে কথা বলার ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আশির দশকে এদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জেঁকে বসা স্বৈরাচারী সরকার পুনরায় মিডিয়ার উপর খড়গহস্ত হওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। প্রতিবাদে টানা কয়েক সপ্তাহ পত্র-পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ থাকে। নব্বই এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণকারী কালাকানুন তুলে নেয়া হলে মিডিয়ার ক্ষেত্রে এক নবতর বিপ্লব সাধিত হয়। অসংখ্য পত্র-পত্রিকা আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায় কিন্ত মাত্র অর্ধ দশক যেতে না যেতেই এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৪ এর মতই দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রাসহ বহু পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে মিডিয়া দলনের নতুন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় সাংবাদিক শামসুর রহমান , সাইফুল ইসলাম মুকুল, শেখ বেলালের মত প্রথিতযশা সাংবাদিকদের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মিডিয়ার উপর এক অযাচিত চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশ, গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে। বর্তমান সরকার এক্ষেত্রে একেবারে রাখঢাক না করেই সম্প্রতি জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ঘোষণা করে মিডিয়ার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আরোপের নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে। উল্লেখ্য, এ সরকারের গত মেয়াদে চ্যানেল ওয়ান, সিএসবি, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি-র মত জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এবং আমার দেশসহ বেশ কিছু পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে সমগোত্রীয় মিডিয়ার একতরফা প্রচারনাকে কাজে লাগিয়ে দেশ পরিচালনায় তাদের নানাবিধ ব্যর্থতা, বিরোধী দল ও মতের উপর নির্যাতন নিপীড়ন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী নানাবিধ চুক্তি, শেয়ারবাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক, পদ্মা সেতু প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রের দুর্নীতি, টেন্ডার চাঁদাবাজি, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টারের মত বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-কে লুকাতে পারেনি। সাগর রুনির মতো খ্যাতিমান সাংবাদিক হত্যার রহস্য উদঘাটন ও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিতকরণ, টকশোগুলোতে আলোচক নির্বাচনে পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এমনকি ফেসবুক ইন্টারনেট এর মতো বিকল্প সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েও কয়েকটি সাহসী মিডিয়ার সচিত্র প্রতিবেদনে গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও একতরফা নির্বাচনকে দেশে বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নামে এক অভূতপূর্ব নীতিমালা ঘোষণা করেছে। এ যেন মিডিয়ার উপর এক প্রতিশোধ স্পৃহার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে উক্ত নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ে যে কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা গোপনীয় বা মর্যাদাহানিকর তথ্য প্রচারে বিধি নিষেধের মাধ্যমে দুর্নীতিপরায়ণ, সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশে বিধি নিষেধ প্রশ্রয়দানের সুযোগ সৃষ্টি, সশস্ত্রবাহিনী বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের ক্রটিপূর্ণ কাজের সমালোচনা করার সুযোগ না থাকা, কোনরকম সংজ্ঞায়নের তালিকা ঘোষণা ছাড়াই কথিত বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তি, তাদের পক্ষ থেকে সৃষ্ট অযাচিত দাবি দাওয়ার বিষয়ে সমালোচনার সুযোগ বন্ধ করা কথিত জনস্বার্থ বিঘিèত হতে পারে এমন রাজনৈতিক সভা সমাবেশের খবর প্রদর্শনের সুযোগ না দেয়ার মত বিষয়গুলো ভিন্নমত প্রকাশের মত গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এহেন বিরোধী দল ও মতের অস্তিত্বহীন একদলীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কোন সুদূর প্রসারী আকাক্সক্ষা প্রতিষ্ঠায় নবতর পদক্ষেপ।

You Might Also Like