বঙ্গবন্ধু এবং জিয়া : যার যার অবস্থানেই থাকতে দিন

আমাদের সময়ের সাংবাদিকতার দিকপালরা একে একে চলে যাচ্ছেন। গিয়াস কামাল ভাই চলে গেছেন, নির্মল দা অনেকদিন রোগে ভুগে ইহলোক ত্যাগ করলেন, ফাজলে রশিদ ভাই নেই, আতাউস সামাদ ভাইও হঠাৎ করেই চলে গেছেন, সেদিন গেলেন মুসা ভাই। ষাটের দশক সত্তুর দশকের সাাংবদিকতার আইকনদের যে কয়জন বেঁচে আছেন বার্ধক্য জ্বড়ায় কাতর। তার মধ্যেও কেউ কেউ লেখালেখি করেন। গাফফার ভাই এখনও ক্ষ্যান্ত দেন নাই। সিরাজুর রহমানের কলম মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে। শফিক রেহমান আজীবন মিডিয়ার সাথেই আছেন কিন্তু তিন বা চার দশক আগে পেশাদার সাংবাদিকের চাইতে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেই বেশী প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। নিয়মিতই লেখালেখি করে যাচ্ছেন। মাঝখানে পত্রিকা বের করেছিলেন, সম্পাদনা করেছেন। এখনও লিখছেন। ব্যক্তিত্বের কারিশমায়ই হোক, মতের পার্থক্য থাকলেও শফিক রেহমান এখনও সকল মহলে শ্রদ্ধার পাত্র। অদম্য মনোবল আর তারুন্যের উচ্ছাস দিয়ে বয়সকে যারা দমিয়ে রেখেছেন শফিক রেহমান তাদের অন্যতম। বয়োবৃদ্ধ এই চিরতরুন ছেলে বুড়ো সকলের কাছেই সমান প্রিয়। শফিক রেহমানের লেখাগুলো আমি পেলেই পড়ার চেষ্টা করি।
বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত। লেখায় দলীয় রাজনীতির প্রভাব ষ্পষ্ট। তারপরও অভিনব উপস্থাপনায় সমসাময়িক রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে ব্যখ্যা বিশ্লেষন করেন মতের ভিন্নতা থাকলেও অনেক সময় তার যুক্তিকে অগ্রাহ্য করা যায়না। সবচেয়ে বড় কথা হাস্য রসাচ্ছলে এমন অনেক কথাই তিনি বলেন যা অনেকে কলমে আনা তো দুরের কথা মনে আনতেও ভয় পান। সাহসী সাংবাদিক হিসাবে তার একটা খ্যাতি আছে। শফিক রেহমান দিন দুই আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তারেক রহমানের কিছু সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং আওয়ামী শিবির থেকে তার প্রতিক্রিয়া সার করে একটি নিবন্ধ রচনা করেছেন। লেখাটি পড়ে মনে হলো এ বিষয়ে আমিও কিছু শেয়ার করতে পারি।
শফিক রেহমান প্রথমেই প্রশ্ন তুলেছেন তারেক রহমান হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অমন শক্ত কথাগুলো বলতে গেলেন কেন। এর একটা জবাবও তিনি দিয়েছেন। আওয়ামী শিবির থেকে যেভাবে কথায় কথায় জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটুকাব্য করা হয় তাকে হেয় করা হয় তার পাল্টা হিসেবেই তারেক রহমান আওয়ামী রাজনীতির প্রাণ ভোমরাকে নিয়ে টান দিয়েছেন। আওয়ামী  শিবির থেকে যেমন জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়ে আসছে তারেক রহমানও তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করে বোঝাতে চাইছেন তিনিও ধোয়া তুলশীপাতা নন। এর উদ্দেশ্য দুইটি। এক. বঙ্গবন্ধুকে তার ভাবমূর্তির স্থান থেকে নামিয়ে আনা। দুই. এর মাধ্যমে অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে আওয়ামী লীগকে নিরুৎসাহিত করা। শফিক রহমানের এই মূল্যায়ন কতটা সঠিক আমি বলতে পারবো না তবে তার একটা বিশ্লেষনের সাথে আমি একমত। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাম্প্রতিক এই বিতর্কে তারেক রহমান আর শেখ হাসিনার স্ট্যাটাস প্রায় এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। দুইজনই তাদের পিতাদের ভাবমূর্তি উজ্জল করার চেষ্টা করে চলেছেন। শেখ হাসিনা চাইছেন তার পিতাকে একজন মহামানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে, তারেক রহমানও চাইছেন তার পিতাকে একজন জাতীয় বীর সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমান করতে। শেখ হাসিনা চাইছেন তারেক রহমানের পিতাকে খলনায়ক ঘৃণিত নিন্দিত হিসেবে তুলে ধরতে, তারেক রহমানও চাইছেন শেখ হাসিনার পিতাকে প্রবঞ্চক ব্যর্থ নেতা হিসেবে প্রমান করতে। শফিক রেহমান বলতে চেয়েছেন তারেক রহমান শেখ হাসিনার পিতাকে নিয়ে অমন ঘাটাঘাটি করতেননা যদি শেখ হাসিনা তার পিতাকে নিয়ে অমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করতেন। তারেক রহমান রাজনীতিতে এসেছেন তাও কম দিন হলোনা। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বা তার মা কখনও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কখনও কোন কটুকাব্য করেন নাই। এমনকি তার প্রয়াত পিতা জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোন বাজে মন্তব্যও করেন নাই। সরকার গঠন করে তারেক রহমান এবং তার মা উভয়ই টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। পক্ষান্তরে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবরে যাবার পথের বেইলি ব্রীজটি সড়িয়ে নিয়েছিলেন।
কথাগুলো সত্য। সম্ভবত: এই কারনেই শফিক রেহমানের এই লেখা নিয়ে আওয়ামী শিবির খেকে এখনও কোন রা শোনা যায় নাই। সবই ঠিক আছে, কিন্তু যে কথাটি না বললেই নয় তারেক রহমান যতই চান শেখ হাসিনা এবং তার স্ট্যাটাস বা অবস্থান এখন পর্যন্ত এক নয়। বা তা কোনদিন হবেও না। দু’জনের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড বয়স এবং রাজনীতিতে পথচলায় বিস্তর ফারাক। হতে পারে তারেক রহমান কখনও রাজনীতিতে শেখ হাসিনার চেয়ে এগিয়ে যাবেন তারপরও তারেক রহমান তার জায়গায়ই থাকবেন শেখ হাসিনাও থাকবেন নিজের জায়গায়ই। যেমন বঙ্গবন্ধু আর জিয়াউর রহমান আছেন যার যার জায়গায়। আমাদের অসুস্থ রাজনীতির কদর্য দিকটা হচ্ছে- এই দু’জনকে আমরা এক করে দেখার চেষ্টা করি বা একজনকে আর একজনের ওপরে বা নীচে নামাতে চাই।
বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্য। ২৩শে মার্চ পর্যন্ত তিনি ইয়াহিয়া খানের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেছেন, ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় তাজউদ্দিন আহমদ টেপ রেকর্ডার নিয়ে গেলে স্বাধীনতার ঘোষনা রেকর্ড করাতে রাজী হন নাই, পালাতেও সম্মত হন নাই, বরঞ্চ পাক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনকে শ্রেয়জ্ঞান করেছেন- এ সবই সত্য। তারপরও স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তারই নামে। স্বাধীকারের দাবী তিনিই প্রথম তুলেছিলেন, মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্নও তিনিই দেখিয়েছিলেন। নয় মাস পাকিস্তানে থাকলেও তিনিই ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা। এ ইতিহাসকে অস্বীকার করবে কেবল অর্বাচিনরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখে নাই বা স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু পক্ষপাতদুস্ট বই পুস্তক পড়ে জেনেছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহন না করে কি করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন- এসব আইনী বা সাংবিধানিক প্রশ্ন তোলা যেতে পারে তবে এটাও মনে রাখতে হবে বাস্তবতা বা মানুষের ইচ্ছাশক্তিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় আইন, বড় সংবিধান। মরহুম জিয়াউর রহমান ’৭৫এর ৭ই নভেম্বর সিপাহিদের সহায়তায় অন্তরীনাবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এলেন, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন এটাও দেশের কোন প্রচলিত আইন বা সংবিধানের ধারামতে নয়, বাস্তবতা এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তির বলে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের এক বিশাল অংশই এক মীথ। ইতিহাস যা লেখা হয়েছে- আবেগনির্ভর। অনেক কিছুই আমরা ধারনা করে নিয়েছি অনেক কিছুই বিশ্বাষ করে নিয়েছি। তা নইলে কেউ গুনে দেখি নাই যুদ্ধে আসলে কতজন শহীদ হয়েছে কত মা বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে- তারপরও বলে গর্বিত হই তিরিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। এটা আমাদের বিশ্বাষ, আবেগ।
একথা অস্বীকার করলে ভুল হবে যে, বঙ্গবন্ধুর যে ইমেজ তার অনেকটাই আবেগ দিয়ে তৈরী। আবেগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙ্গালীর আসনে বসিয়েছি। বাঙ্গালী বললে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ উভয় অঞ্চলের বাঙ্গালীকেই বোঝায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীরা একথা শুনে হাসে। তাদের কাছে শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীরা হচ্ছেন রাজা রামমোহন রায় ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতাজী সুভাস বসু। তারপরও আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুই ছিলেন আইন তিনিই ছিলেন সংবিধান, এটাই ছিল বাস্তবতা। তিনি যে পাসপোর্টেই বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে থাকুন সরকারের যে পদই গ্রহন করে থাকুন তা ছিল গনমানুষের আকাংখার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আবার এটাও বাস্তবতা- তিনি ছিলেন একজন অসফল প্রশাসক। বঙ্গবন্ধুকে এ দেশের মানুষ এক সময় মহামানবের মর্যাদায় তুলেছে কিন্তু তিনি অতিমানব ছিলেন না। ভুলত্রুটি তারও ছিল। সাফল্য এবং ব্যর্থতা- এই দুই মিলিয়েই তিনি মানুষ বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর স্থান নির্ণিত হয়েছে এই নিরিখেই। তাকে সেখান থেকে টেনে নামানো বা আরও ওপরে তোলার প্রয়াস তাই নিরর্থক।
তেমনিভাবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই ক্রান্তিকালে আলেকাবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পঁচিশে মার্চের পর যুদ্ধের প্রস্তুতিবিহীন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড দেশের মানুষকে হায়েনার মুখে ফেলে প্রান বাঁচাতে ভারতে পালালে এগিয়ে এসেছিলেন সেদিনের এক সামান্য মেজর। চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাই তাকে সামনে নিয়ে এলেও সেদিন তার কন্ঠস্বর সাড়ে সাত কোটী মানুষের মনে আশা জাগিয়েছিল। অন্ধকারে আলোর রেখা দেখিয়েছিল। এখানে কে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন সে বিতর্ক অর্থহীন, স্বাধীনতা যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে তা কোন ঘোষনার জন্য বসে থাকেনা। পরিবেশ পরিস্থিতিই জিয়াউর রহমানকে তার অবস্থানে নিয়ে গেছে। ’৭৫-এর সেই টালমাটাল পরিস্থিতিতেও ঘটনাচক্র তাকে আবার পাদপ্রদীপের আলোয় টেনে আনে। নিষ্টুরতার কলংকতিলক কপালে সেঁটে গেলেও কঠিন হাতে প্রতিকূলতা কাটিয়ে তুলে দেশকে আবার একটা সিস্টেমে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে পক্ষপাতহীন ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধু আছেন তার অবস্থানে জিয়াউর রহমান তার জায়গায়। দু’জন যার যার মত ভিন্ন অবস্থানে। এখানে কেউ কারও প্রতিদ্বন্ধি নন। দু’জনই ইতিহাস অর্পিত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখানে দু’জনের পারষ্পরিক তুলনা বা একজনকে আর একজনের ওপরে বা নীচে বসানো মতলববাজী মানসিকতার পরিচায়ক ছাড়া আর কি হতে পারে!
জিয়াউর রহমান বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেছেন বা ক্যান্টনমেন্টে বসে পার্টি গঠন করেছেন- এ ধরনের যত অপবাদই দেয়া হোক, জিয়াউর রহমানের গড়া সেই পার্টিটিই আজ দেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। দেশের সংখ্যাগড়িষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করে ভারতের শৃংখল থেকে দেশকে মুক্ত করতে এই দলটিই একমাত্র ভরষা। কাল নিরুপেক্ষ ভোট হলে পরশু তারা ক্ষমতায়। কাজেই তারেক রহমানের বিএনপি আজ একটি বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর। শেখ হাসিনা এদেরকে মোকাবিলার যে নেতিবাচক কৌশল নিয়েছেন তা দলটিকে কেবল শক্তিশালীই করছে। ক্ষতিগ্রস্থ করছে শেখ হাসিনা, তার দল এবং এই দলের যাবতীয় অর্জনকে। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে। সভ্য রাজনীতি এবং উন্নত মানসিকতার পরিচায়ক হবে সেটাই- বঙ্গবন্ধু এবং জিয়াউর রহমানকে যার যার জায়গায় থাকতে দেয়া। টেনে নামানোর চেষ্টা কারও ভাবমূর্তিকেই উজ্জল করবে না।

You Might Also Like