প্রকাশিত: ১৭ আগষ্ট ২০২৬ , ০৫:৫৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী অতিক্রান্ত হলো। সেই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো কাঠামো, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষাও সৃষ্টি করেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং শেষ পর্যন্ত জুলাই জাতীয় সনদের জন্ম। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুলসংখ্যক ভোটার সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে জুলাই সনদ এখন আর শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমঝোতার দলিল নয়, এর সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই গণরায় বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই নতুন রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই পরিষদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগোনোর কথা। বাস্তবে ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। তাদের বক্তব্য, ওই বাস্তবায়ন আদেশের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে তাদের আপত্তি ছিল, সেসব বিবেচনায় রেখেই সংস্কার করতে হবে।
সরকার অবশ্য সংস্কার পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছে, এমনটিও বলা যাবে না। সংসদ গত ১৩ জুলাই সাংবিধানিক সংশোধন-সংক্রান্ত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। সরকার বলছে, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছিল সেগুলো এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বিবেচনায় নিয়ে সংসদীয় পদ্ধতিতেই সংশোধন এগিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠছে। জনগণ যে সংস্কার কাঠামোর ওপর ভোট দিয়েছে, তার পরিবর্তে রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নতুন কোনো কাঠামো তৈরি হলে গণভোটের রাজনৈতিক অর্থ কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট নির্ধারিত হয়েছে এবং বিরোধী ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিরোধীদের দাবি, জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যে নতুন ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটি কার্যকর
হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত ছিল। সরকার ভিন্ন সাংবিধানিক পথে এগোচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন কেবল একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর বিষয় থাকছে না, সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
এখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে। গণভোটের ফলকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন উপেক্ষা করে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন প্রকাশ্য আলোচনা। কোন সংস্কার বাস্তবায়িত হবে, কোনটির জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন, কোথায় রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি রয়েছে এবং কত দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে, সরকারকে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
বিশেষ করে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারণ হলো ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নিজেদের সুবিধামতো সাজানোর প্রবণতা। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা ছিল এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা। আজ যদি আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বনাম বিরোধী শক্তির পুরোনো দ্বন্দ্বেই সংস্কার আটকে যায়, তবে রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো সাময়িক লাভবান হবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র এবং জনগণের আস্থা।
জুলাই সনদ কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তার প্রতিটি শব্দ অপরিবর্তনীয়। আবার এটি এমন একটি কাগজও নয়, যা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ফাইলবন্দী করে রাখা যাবে। সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা করতে হবে রাজনৈতিক ঐকমত্য, আইনি স্বচ্ছতা এবং জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান রেখে।
এখন প্রয়োজন জয়-পরাজয়ের রাজনীতি নয়, আস্থার রাজনীতি। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, তারা গণভোটের রায়কে রাজনৈতিক বাধা নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্ব হিসেবে দেখছে। বিরোধীদেরও সংস্কারকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির অস্ত্র না বানিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে আসতে হবে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান শুধু দিবস পালন, স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা বক্তৃতায় নয়। তার প্রকৃত সম্মান হবে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারবে না। গণরায়ের মর্যাদা রক্ষা তাই আজ শুধু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।
আমার বিবেচনায় “গণরায়ের মর্যাদা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের সামনে বড় পরীক্ষা” শিরোনামটি মঙ্গলবারের সম্পাদকীয় পাতায় যথেষ্ট ওজনদার হবে। এটি সরকারবিরোধী বা সরকারপন্থী অবস্থান না নিয়ে জনগণের রায় ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার