ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

.নির্বাসন থেকে রাজপথ: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও আগামীর বাংলাদেশ

.নির্বাসন থেকে রাজপথ: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও আগামীর বাংলাদেশ

১৮ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, লন্ডনের রিচমন্ড পার্কের নির্জনতা থেকে ঢাকার জনসমুদ্র—তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা।

একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও লাজবাব জনস্রোত

গত ২৫ ডিসেম্বর, যখন কুয়াশাচ্ছন্ন ঢাকার আকাশে উড়োজাহাজটি অবতরণ করল, তখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা যেন এক বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে ওঠে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাড়ি জমানোর পর এই প্রথম তিনি দেশের মাটিতে পা রাখলেন।

বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসভবন পর্যন্ত যে জনস্রোত দেখা গিয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। তবে এই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি হারান তাঁর মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। শোকাতুর তারেক রহমানকে দেখা গেল ভিন্ন এক অবয়বে—ধীরস্থির, পরিপক্ক এবং সংযত।

টাইম ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে এক ‘নতুন’ তারেক রহমান

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী টাইম (TIME)-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তাঁর সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর শারীরিক কষ্টের কথা। তিনি বলেন, “খুব ঠান্ডা শীত এলে এখনো পিঠে ব্যথা হয়। কারাগারে নির্যাতনের ফল। কিন্তু আমি এটাকে বোঝা মনে করি না। এটা আমাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

২০০৭-০৮ সালের সেই বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৮ মাস কারাবন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর যে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার ক্ষত আজও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। মেরুদণ্ডের সেই জটিলতা নিয়েই তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

নির্বাচনী সমীকরণ: ৭০ শতাংশের প্রত্যাশা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম নির্বাচন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিএনপির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে—প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের সমর্থন দিচ্ছে।

তারেক রহমান নিজেকে জেন-জেড (Gen-Z) প্রজন্ম এবং প্রবীণ রাজনীতির মধ্যে এক সেতুবন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাঁর এই অবস্থান কেবল পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে নয়, বরং দলের লক্ষ লক্ষ কর্মীর ত্যাগের বিনিময়ে।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও ‘প্ল্যান ৩১’

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। তারেক রহমান তাঁর সাক্ষাৎকারে উন্নয়নের এক বিশদ রূপরেখা তুলে ধরেছেন:

খাল খনন কর্মসূচি: ১২ হাজার মাইল খাল খননের মাধ্যমে কৃষি বিপ্লবের সূচনা।

সবুজ বিপ্লব: বছরে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং নগর বনায়ন।

জ্বালানি নিরাপত্তা: বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

দক্ষ জনশক্তি: প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ কারিগরি শিক্ষা সংস্কার।

স্বাস্থ্যসেবা: পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সবার জন্য আধুনিক চিকিৎসা।

তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই মানুষ আমাকে পূর্ণ সমর্থন দেবে।”

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতি

রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—আগামীর সরকারের জন্য এটি একটি এসিড টেস্ট। তারেক রহমান ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বাস্তববাদী’ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা ও চীনের সাথে উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়েও তিনি সচেতন।

সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন

বর্তমানে দেশে মব জাস্টিস এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান এবং তরুণদের মধ্যে উগ্রপন্থার প্রভাব নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। এর জবাবে তারেক রহমান কঠোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন। প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুরা যেন রাস্তায় এবং ব্যবসায় সুরক্ষিত থাকে।”

ব্যক্তিমানুষ তারেক: সিনেমা, বই ও একাকীত্ব

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাইরেও তারেক রহমানের এক নিভৃত জীবন রয়েছে। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি রিচমন্ড পার্কে দীর্ঘ সময় হাঁটতেন এবং ইতিহাসের বই পড়তেন। মজার তথ্য হলো, হ্যারিসন ফোর্ড অভিনীত ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ সিনেমাটি তিনি আটবার দেখেছেন। দেশে ফেরার পর কঠোর নিরাপত্তার বেড়াজালে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে বেশি মিস করি।”

তারেক রহমানের সামনে এখন পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ। একদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার, অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তবে ১৭ বছরের নির্বাসন তাঁকে যে ধৈর্য শিখিয়েছে, তার প্রতিফলন এখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ এখন দেখছে এক পরিণত নেতাকে, যিনি কেবল স্লোগানে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বিশ্বাসী।