এখন সময় বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৬:১৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

আইনশৃঙ্খলাই কি সরকারের নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা

তিন দিনে রাজধানী ঢাকায় অন্তত চারটি হামলা, ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার ঘটনা। মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ, ওসি প্রত্যাহার, নয়জন গ্রেপ্তার। সরকার বলছে অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনের দলীয়করণকে রাজনৈতিক দাবির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট। বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি গভীরতর শাসনগত সতর্কসংকেত?

রাজধানী ঢাকায় কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ দিচ্ছে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট, জমি ও ভবন দখলের চেষ্টা, প্রকাশ্য ভাঙচুর, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে হামলা, সব মিলিয়ে জননিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গত তিন দিনে ঢাকায় অন্তত চারটি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে। ঘটনাগুলোর বেশির ভাগের পেছনে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টার, মোহাম্মদপুরের একটি জমি, আদাবরের একটি বহুতল ভবন এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও আক্রান্ত হয়েছে। 

এর মধ্যে মিরপুরের ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙতে এলো দুই শতাধিক মানুষ

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুর এলাকায় বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল সেখানে হামলা চালায় বলে প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ। নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রেখে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন জিনিস লুট করা হয়। পরে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে ভবনের অংশবিশেষ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি। 

এত বড় একটি দল কয়েক ঘণ্টা ধরে রাজধানীর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালাতে পারল কীভাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়েছে পুলিশের ভূমিকা সামনে আসার পর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নয়জনকে গ্রেপ্তারের কথাও সরকার জানিয়েছে।

পুলিশের নিজস্ব প্রাথমিক অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, হামলাকারীরা লুট করা সামগ্রী গাড়িতে তুলছিল যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, কিন্তু গাড়িটি চলে যাওয়ার আগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

এখানেই ঘটনাটি একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলা থেকে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এক ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই আরও ঘটনা

মিরপুরের ঘটনার পরদিন মোহাম্মদপুরে কয়েকশ মানুষ দিনের আলোয় একটি জমিতে ঢুকে অফিস ভাঙচুর, নগদ অর্থ ও সরঞ্জাম লুট করে এবং পরে টিন দিয়ে জমিটি ঘিরে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। 

একই সময়ে আদাবরে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল, যাদের কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, একটি বহুতল ভবনে ঢোকার চেষ্টা করে। ভবনমালিকের অভিযোগ, চাঁদা না দেওয়ায় একই গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তিটি দখলের চেষ্টা করছে। ৯৯৯-এ ফোন করার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পুলিশ পৌঁছেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। 

এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে একই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটায় উদ্বেগটি আর একটি থানা বা একটি মহল্লায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।

সরকার বলছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নেই

সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব অস্বীকার করছে না।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। তাঁর বক্তব্য, “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধী অপরাধীই।” 

এই নীতিগত ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারের জন্য আসল পরীক্ষা হবে ঘোষণাটি মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয়।

কারণ আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য পরিমাপ হয় অপরাধ ঘটার পর বিবৃতিতে নয়, অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত পুলিশি ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।

বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রে আসছে আইনশৃঙ্খলা

এই পরিস্থিতির আরেকটি রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট ইতোমধ্যে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দাবির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা চট্টগ্রাম লংমার্চের দাবির মধ্যেও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ছিল।  

পরে ঢাকা রংপুর লংমার্চ ঘিরেও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলেছেন জোটের নেতারা। জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে দলীয়করণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। এগুলো বিরোধী দলের রাজনৈতিক অভিযোগ, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। 

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার পর জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, “প্রশাসন কোথায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথায়?” তিনি হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। 

ফলে আইনশৃঙ্খলা এখন শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয় থাকছে না। এটি ক্রমেই সরকার ও বিরোধী জোটের রাজনৈতিক মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

স্বাধীন পর্যবেক্ষকের সতর্কবার্তা

ট্রান্সপ্রেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবিও সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংস্থাটি বলেছে, এসব ঘটনা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে তারা নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। 

এই মূল্যায়ন রাজনৈতিক বিরোধী দলের বক্তব্যের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

বিচ্ছিন্ন ঘটনা, না কি প্রবণতা?

এখানেই সাংবাদিকতার সতর্কতা সবচেয়ে জরুরি। কয়েক দিনের কয়েকটি ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। একটি সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখল এবং পুলিশের প্রতিক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক পরিসংখ্যান প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে ঘটনাগুলোকে নিছক বিচ্ছিন্ন বলে পাশ কাটানোরও সুযোগ নেই।

কারণ মিরপুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ সরকার নিজেই স্বীকার করেছে। একই সময়ে দখল ও হামলার আরও অভিযোগ এসেছে। স্বাধীন পর্যবেক্ষক উদ্বেগ জানিয়েছে। বিরোধী জোট বিষয়টিকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ করেছে।

এই তিনটি ধারা যখন একই বিন্দুতে এসে মিলছে, তখন আইনশৃঙ্খলা সরকারের জন্য শুধু প্রশাসনিক সমস্যা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও নাগরিকের আস্থার পরীক্ষা।

একজন সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নিরাপত্তা বিচার করেন না। তিনি দেখেন, রাতে বিপদে পড়লে পুলিশ আসছে কি না। তাঁর দোকান, বাড়ি বা জমি কেউ জোর করে নিতে পারছে কি না। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া থানায় তিনি সমান বিচার পাচ্ছেন কি না।

সরকার যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই”, তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি সতর্কবার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

আর যদি রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীর জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটিই দ্রুত সরকারের আরও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

এই পরীক্ষার ফল নির্ধারণ করবে কোনো দলের বক্তৃতা নয়, মাঠে আইনের সমান প্রয়োগ।