দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঠিক আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক চাঞ্চল্যকর বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার রাত ১১টার দিকে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘লাইলাতুল গুজব’ বা গুজবের রাত হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দেশবাসীকে কোনো ধরনের অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সবাই সাবধান, এই সমস্ত গুজবকে পাত্তাই দিবেন না। ইনশাআল্লাহ সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।” ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার দিনভর দেশের বিভিন্ন জেলায় জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনি ময়দানে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড প্রদান করে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নীলফামারীর সৈয়দপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং ইসিতে বিএনপির নালিশের পর মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ঠিক এই মুহূর্তেই ডা. শফিকুর রহমান ‘লাইলাতুল’ (আরবি শব্দ যার অর্থ রজনী) শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে বিরোধীদের অভিযোগকে ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
জামায়াত আমিরের এই পোস্টটি মূলত তার দলীয় কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্তি থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগের রাতে যখন ভোটারদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের নানা চেষ্টা চলে, তখন শীর্ষ নেতার এই ‘সতর্কবার্তা’ মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে টাকা ছড়ানোর মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের মুখে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণকে ‘গুজব’ হিসেবে চিহ্নিত করাই ছিল এই বার্তার মূল লক্ষ্য।
ভোটের আগের রাতে জামায়াত আমিরের এই ‘লাইলাতুল গুজব’ মন্তব্যটি কেবল একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্ট নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ডিফেন্স। যখন একই দিনে বিএনপি নির্বাচন কমিশনের কাছে জামায়াতের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছে, তখন ডা. শফিকুর রহমান পাল্টা শব্দযুদ্ধের মাধ্যমে সেটিকে নাকচ করে দিলেন। এটি একইসাথে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির প্রয়াসও হতে পারে, যাতে অহেতুক অভিযানে দলটির কর্মীরা হয়রানির শিকার না হয়। তবে নির্বাচনি ময়দানে অর্থের প্রভাব একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা এবং এটি কেবল অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত সত্য কতটুকু আর গুজব কতটুকু, তা প্রমাণের দায়ভার যেমন প্রশাসনের, তেমনি ভোটের মাঠে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণের দায়ভার রাজনৈতিক দলগুলোর। এই ‘গুজবের রাত’ কাটিয়ে কালকের সূর্যোদয় ব্যালট বাক্সে কী বার্তা নিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।