চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় হুঙ্কার দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করতে আসলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। সোমবার বিকেলে সীতাকুণ্ড সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াত আয়োজিত এই জনসভায় তিনি প্রধান অতিথির ভাষণ দেন।
বীর চট্টলার ভাষায় সম্বোধন ও ফ্যাসিবাদের অবসান
জনসভার মঞ্চে উঠেই ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “অনারা গম আছন নি?” মুহূর্তেই পুরো মাঠ করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, গত দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ফ্যাসিবাদের রাজত্ব চলেছে। তাদের স্লোগান ছিল—‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো’। কিন্তু সেই দিন এখন অতীত। এবারের স্লোগান হবে—‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমারটা তুমি দাও’। তবে সাবধান করে দিয়ে তিনি বলেন, “যদি কেউ আমার ভোট কেড়ে নিতে আসে, তবে তার হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।”
ডাকসু-জকসু’র বার্তা ও তরুণ সমাজের রায়
নির্বাচনি প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, পরিবর্তনের হাওয়া শুরু হয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে। তিনি বলেন, “ডাকসু দিয়ে যে পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল, তা জকসু-তে এসে আপাতত থেমেছে। এই পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তারা আর কোনো চাঁদাবাজ বা দখলদারদের পক্ষে নেই। ১২ তারিখ এই তরুণেরাই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ
নিজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অপপ্রচারের জবাব দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি বলেই একটি গোষ্ঠী আমার পেছনে লেগেছে। কিন্তু এতে কোনো লাভ হবে না, বরং মিথ্যাচার করতে গিয়ে তারা নিজেরাই ফেঁসে যাবে।” তিনি নারীদের সম্মান নিয়ে বলেন, “মায়েরা আমাদের মাথার তাজ। তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
১১ দলীয় জোটের প্রতিশ্রুতি: ৫৪ বছরের অপ্রাপ্তি মোচন
দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে যতটুকু উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি ভোটের রাজনীতির ‘মিষ্টি কথা’ এবং জয়ী হওয়ার পর ‘সুর পাল্টে ফেলা’র সংস্কৃতিকে দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, “আমরা বা জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসতে চাই না, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষ ক্ষমতায় আসুক। যারা ১৩ তারিখ থেকে একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখতে চান, তারা ১১ দলীয় জোটকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।”
বিশ্লেষক অভিমত: জামায়াতের কৌশলী অবস্থান ও জোটের সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীতাকুণ্ডের এই জনসভায় ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে:
প্রতিরোধের রাজনীতি: ‘হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া’র মতো কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি মূলত মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন এবং প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছেন।
আঞ্চলিক ও তারুণ্য কেন্দ্রিক রাজনীতি: চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে সংযোগ স্থাপন এবং ডাকসু-জকসু’র ফলাফলকে নির্বাচনি প্রচারণায় আনা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার একটি কার্যকর পদ্ধতি।
পাওনা ও জাস্টিস: জুলাই বিপ্লবের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানকে নির্বাচনি ডাইমেনশনে নিয়ে এসে তিনি জনগণের ন্যায্য পাওনা আদায়ের বিষয়টি সামনে এনেছেন।
বণ্টনমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা: তিনি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার কথা না বলে ‘রাষ্ট্রের সবকিছু বণ্টন করে দেওয়ার’ কথা বলেছেন, যা মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রার্থীদের পরিচিতি ও সমাপনী
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জামায়াত আমির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাতটি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের মঞ্চে উপস্থিত করিয়ে জনগণের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি পরিবারতন্ত্র ও দলীয় সরকারের রাজত্ব অবসানের ডাক দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।