ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

‘নারীর অবমাননাকারীরা দেশদরদী হতে পারে না’—তারেক রহমান

‘নারীর অবমাননাকারীরা দেশদরদী হতে পারে না’—তারেক রহমান

যশোরের উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠ আজ পরিণত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ক্ষমতাসীন ও তাদের মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করেন। বিশেষ করে নারী অধিকার, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তার বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

নারীর মর্যাদা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা

বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের এক নেতার নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। যারা মা-বোনদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কথা বলে এবং অশালীন গালিগালাজ করে, তারা আর যাই হোক, কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদী হতে পারে না।”

প্রতিপক্ষ নেতার ‘আইডি হ্যাক’ হওয়ার দাবিকে তিনি স্রেফ ‘মিথ্যাচার’ ও ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে এটি একটি পরিকল্পিত বক্তব্য ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “নির্বাচনের ঠিক আগে যারা জনগণের সামনে অবলীলায় মিথ্যা বলতে পারে, তাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ কতটুকু নিরাপদ?”

১৯৭১ ও বর্তমানের যোগসূত্র

তারেক রহমান তার বক্তব্যে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি অভিযোগ করেন, আজকের এই নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীর পূর্বসূরীরাই ১৯৭১ সালে দখলদার বাহিনীর দোসর হিসেবে লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ওপর নির্যাতনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি বলেন, “এই গোষ্ঠীটি আজও তাদের সেই পুরনো চরিত্র বদলাতে পারেনি। তারা একদিকে ইসলাম কায়েমের বুলি আউড়ায়, অন্যদিকে নারীর কর্মসংস্থান নিয়ে নোংরা কথা বলে।”

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের নবীজির সহধর্মিণী বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। অথচ তারা চায় নারীদের ঘরের ভেতরে আটকে রাখতে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, তাদের দলের নারী কর্মীরাই আবার মাঠে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করছেন। এটি চরম মুনাফেকি ছাড়া আর কিছুই নয়।”

উন্নয়নের ব্লুপ্রিন্ট: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি আধুনিকায়ন

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আমলের নারী শিক্ষার প্রসারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে:

ফ্যামিলি কার্ড: প্রতিটি পরিবারের গৃহিণীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করা হবে, যার মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হবে।

চিনিকল পুনরুজ্জীবন: যশোরের বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে চিনি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও আখচাষিদের ভাগ্যোন্নয়ন করা হবে।

ফুল রফতানি: যশোরের গদখালীর ফুল চাষকে আধুনিকায়ন করে সরাসরি বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান।

রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই বক্তব্যটি অত্যন্ত কৌশলী এবং সময়োপযোগী। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:

১. নারী ভোটব্যাংক ও সামাজিক অবস্থান: দেশের বিশাল নারী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের পক্ষে টানতে এবং প্রতিপক্ষের নেতিবাচক ইমেজকে কাজে লাগাতে তারেক রহমান নারীর মর্যাদা ইস্যুটি সামনে এনেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, নারীর ক্ষমতায়ন ও সম্মান কেবল বিএনপির মাধ্যমেই সম্ভব।

২. ধর্মীয় উদারতা ও আধুনিক ভাবমূর্তি: ধর্মকে ব্যবহার করে নারীদের পিছিয়ে রাখার যে রাজনীতি প্রচলিত আছে, তার বিপরীতে রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ দিয়ে তিনি বিএনপির একটি ‘মডারেট’ ও ‘আধুনিক’ ইসলামি ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তুলেছেন। এটি সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

৩. সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি: ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর ধারণাটি তৃণমূল পর্যায়ে দারুণ জনপ্রিয় হতে পারে। এটি সরাসরি ভোটারদের পকেটে রাষ্ট্রীয় সুবিধার নিশ্চয়তা দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

৪. আঞ্চলিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান: যশোরের স্থানীয় সমস্যা, যেমন—বন্ধ চিনিকল সচল করা এবং গদখালীর ফুল চাষ আধুনিকায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আঞ্চলিক ভোটারদের মধ্যে বিশেষ ভরসা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল করার অঙ্গীকার করেছেন।

পর্যবেক্ষণ: তারেক রহমান ১২ তারিখের ব্যালট বিপ্লবের যে ডাক দিয়েছেন, তা মূলত ভোটারদের মধ্যে একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। নারীর অধিকার এবং একাত্তরের চেতনার সমন্বয়ে তিনি এক নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন।

বক্তব্যের শেষে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে শপথবাক্য পাঠের ভঙ্গিতে বলেন, “করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।” আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ তাদের হৃত অধিকার ফিরে পাবে—এমনটিই তার প্রত্যাশা।