চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২০০টি পৃথক হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩৪ জন সাংবাদিক। এছাড়া ৬০ জন লাঞ্ছিত, ৪৯ জন হুমকির সম্মুখীন এবং ১১ জনকে আটক করা হয়েছে।
বুধবার মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কলহে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংস ঘটনায় পাঁচ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে এইচআরএসএস জানিয়েছে, এ সময়ে ৪০টি সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জন আটক হয়েছেন। আহত ও আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারী রয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমালোচনাকে কেন্দ্র করে একজনকে পিটিয়ে হত্যা, দুজনকে আহত করা, ১৮ জনকে আটক এবং ১৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে এবং একজনকে মারধরের শিকার হতে হয়েছে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের আওতায় ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করে ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে, ২০২৫ সালের একই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়েছিল। ওই বছর মোট ১৬টি মামলায় ২৩ জনকে আসামি করা হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় ১২ জনকে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচজন, গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ২৬ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ৩২ জন হাজতি। তাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৫ জন, বিএনপির একজন এবং ৪২ জন সাধারণ কয়েদি রয়েছেন।