ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

২৮ মিনিটেই পাস ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল’, বিনিয়োগ কাঠামোতে বড় পরিবর্তনে প্রশ্ন সংসদীয় প্রক্রিয়া নিয়ে

২৮ মিনিটেই পাস ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল’, বিনিয়োগ কাঠামোতে বড় পরিবর্তনে প্রশ্ন সংসদীয় প্রক্রিয়া নিয়ে

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় একক কর্তৃপক্ষ গঠনের লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল’ জাতীয় সংসদে মাত্র ২৮ মিনিটের আলোচনার মধ্যেই পাস হয়েছে। একই দিনে বিলটি উত্থাপন ও পাস হওয়ায় বিরোধী দল সংসদীয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি নতুন কোনো আইন নয়, বরং বিদ্যমান একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে একীভূত করার উদ্যোগ।

বুধবার বিকেলে সংসদের সম্পূরক কার্যসূচিতে প্রধানমন্ত্রীের পক্ষে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাধারণত কোনো বিল সংসদে উত্থাপনের পর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে এই বিলটি সরাসরি পাসের জন্য উত্থাপন করা হয় এবং প্রায় ২৮ মিনিটের বিতর্ক শেষে কণ্ঠভোটে তা অনুমোদিত হয়।

বিলটি পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিলুপ্ত করে নতুন ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি আইন রহিত ও হেফাজতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিরোধী দলের সদস্যরা বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানিয়ে বলেন, ছয়টি পূর্ববর্তী আইন ও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংসদের জন্য একটি উদ্বেগজনক নজির। তাঁদের মতে, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে একই দিনে বিল উত্থাপন ও পাস করা আইন প্রণয়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো আইন তাড়াহুড়া করে প্রণয়ন করা উচিত নয়। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেচনায় আইন বুঝেশুনে প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তিনি সংসদের শেষ দিনে এমন উদ্যোগকে একটি "খারাপ নজির" বলে মন্তব্য করেন।

এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বিলের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী আনার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্যদের যৌক্তিক সংশোধনী প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে আগামী অধিবেশনেও তা গ্রহণ করা হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, বিদ্যমান বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ একই ধরনের উদ্দেশ্যে কাজ করায় কার্যক্রমের মধ্যে ওভারল্যাপ তৈরি হয়েছে। নতুন আইনটির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করা হবে। তাঁর ভাষায়, বিলটিতে জটিল কোনো বিষয় থাকলে এটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব তিনিই দিতেন।

নতুন আইনের অধীনে গঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। একজন চেয়ারম্যান এবং সাতজন সদস্য কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। চেয়ারম্যান হবেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের সরকার নিয়োগ দেবে।

কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী অথবা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি। বোর্ডে অর্থ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিল্প, বাণিজ্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, একাধিক সচিব এবং বেসরকারি খাতের চারজন প্রতিনিধি থাকবেন। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্তত দুজন নারী হতে হবে।

নতুন কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব হবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রচারণা চালানো, আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব অনুমোদন, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন।

বাংলাদেশ সরকার এই আইনকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, বিলটি পাসের প্রক্রিয়া সংসদীয় জবাবদিহিতা ও আইন প্রণয়নের মানদণ্ড নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়াও সমানভাবে গুরুত্ব বহন করে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।